অস্তিত্ব রক্ষার্থে পানি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার

27

পানির অপর নাম জীবন। জীবনের জন্য পানির গুরুত্ব অপরিসীম। পানি ছাড়া জীবন বাঁচানো যায় না। এই বৈচিত্র‍্যময় গোটা বিশ্ব ভূমণ্ডলে পৃথিবী নামক গ্রহে পানির উপস্থিতি প্রতিটি প্রাণীর জীবনের অস্তিত্ব টিকে রাখার জন্য পানি অপরিহার্য। বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য এই ভূ-গর্ভস্থ পানি অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। যার প্রয়োজন অন্য কিছু দিয়ে মেটানো যাবে না।

পৃথিবীর মোট আয়তনের ৭১ শতাংশ পানি হলেও বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে,,যা আমাদের জন্য ভাবনার অন্যতম একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব পানি দিবসে এক সম্মেলনে সতর্ক করে বলা হয়েছিলো – তেল বা গ্যাস নয়,আগামীতে বড় কোনো যুদ্ধ হয় সেটা হবে তাও বিশুদ্ধ পানিকে কেন্দ্র করে। যা তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ নামে অভিহিত হবে। পৃথিবীতে যে পরিমাণ পানির উপস্থিতি তার মাত্র ৩ শতাংশ পানযোগ্য। বাকি ৯৭ শতাংশ বিভিন্ন ভাবে দূষণের শিকার।

বিজ্ঞান প্রযুক্তির আধুনিক ছোঁয়ায় যেখানে মানুষের জীবন ক্রমশই আয়েশী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় সেখানে সেখানে দেড়শো কোটিরও বেশি মানুষের জন্য নেই নিরাপদ পানির সংস্থান। প্রতিবছর নিরাপদ পানির অভাবে পানিবাহিত রোগে পৃথিবীজুড়ে মারা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। যেসব অঞ্চলে বিশুদ্ধ সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিয়ে সংকট রয়েছে সেখানকার চিত্র আরো ভয়াবহ ও নির্মম। এটা স্পষ্ট যে,যেসব অঞ্চলে পানি স্বল্পতা, নিরাপদ সুপেয় পানির অভাব রয়েছে সেসব অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে পানি যুদ্ধের ভয়াবহ করুণ পরিস্থিতি। নিরাপদ পানির জন্য নিজ নিজ এলাকা ত্যাগ করে অন্যান্য দেশে গিয়ে পানির জন্য যদ্ধ করছে। যেমনঃ  লেবালন-ইসরায়েলের মধ্যে হাসবানি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ রয়েছে,ইসরায়েল- ফিলিস্তিন ও জর্দানের মধ্যে জর্দান নদী নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। এছাড়াও ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে হেলমান্দ নদী নিয়ে টানাহেঁচড়া লেগে আছে। শুধুমাত্র নিরাপদ সুপেয় পানির জন্যই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে বিশুদ্ধ পানির উৎস হচ্ছে প্রাকৃতিক জলধারা, নদ-নদী,বৃষ্টির পানি এ ভূ-গর্ভস্থ পানি। পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল আমাদের দেশেও  নিরাপদ পানির এই রকম ঝুঁকির বাহিরে নয়। প্রতি বর্গকিলোমিটারে মিঠা পানির প্রাপ্যতার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সবার শীর্ষে। এসব সত্ত্বেও বছরের তিন-চার মাস দেশের বিরাট অংশ পানি শূণ্যতায়  দেশ জুড়ে হাহাকার লেগেই থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি সেন্টার ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের হিসাবে গত বছরের ৩০ জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৩৬ হাজার ২২৩ জন বন্যার কারণে নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আর মারা গেছেন ১৯৩ জন। ২০২০ সালের জনসংখ্যার পরিসংখ্যানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১১১৫ জন লোক বাস করে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাওয়া জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য বেড়ে চলেছে উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ। আর এই ধান চাষের জন্য প্রয়োজন পড়ছে সেচব্যবস্থা। যার বেশির ভাগ নির্ভর করছে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবস্থার উপর। 

বাংলাদেশ অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত নগরায়ন গড়ে উঠেছে যার জন্য ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক জলাশয় রীতিমতো বিলীন হয়ে যাচ্ছে।নানা কারণে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ক্রমাগত বিলীন ও দূষিত হচ্ছে,তাই মানুষ বাধ্য হয়েই ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে রাজধানীতে উপরিভাগে যত পানির উৎস আছে তার ৯০-৯৫ শতাংশই দূষণের শিকার। এছাড়াও ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ নদীগুলো প্রায় শতভাগ দূষিত। আর এসব দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ বর্জ্য পদার্থ। ঢাকার অধিকাংশ শিল্পকারখানা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অব্যবহৃত বর্জ্য গুলো সরাসরি নদীতে ফেলে নদীর পানি  রীতিমতো দূষিত করে তুলছে। যার দরুন রাজধানী বাসীর বেশিরভাগ মানুষ নিরাপদ পানির অভাব বোধ করছে।এতে রাজধানীর অধিকাংশ বাসিন্দা ভূ-গর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। 

গ্রামাঞ্চলে নদী-নালা,খাল-বিলে ভরপুর থাকলেও দিন দিন এগুলো মানুষের কারণে বিভিন্ন ভাবে দূষণের শিকার হয়ে পড়ছে। ফলে অধিকাংশ গ্রামের মানুষ দিন দিন টিউবওয়েল ও নলকূপের পানির উপর নির্ভর হয়ে পড়ছে।  গ্রামের অধিকাংশ সেচ ব্যবস্থা গভীর-অগভীর নলকূপের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে।  সব ধরনের ফসলিজমির সেচ ব্যবস্থা নলকূপের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। কৃষকরা পানির সেচ ব্যবস্থাপনার জন্য ভূ-গর্ভস্থের পানি বিরামহীনভাবে উঠাতে থাকে,আর এতেই হুমকির মুখে পড়ছে জমির তলার ভিত,আর যা আসতে আসতে ভূমি ধ্বসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

আমরা যারা গ্রামে অযথা কারণে পানি দূষণ ও অপচয় করছি তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকাতে। তারা বিভিন্নভাবে পানির সংকটে ভুগছে। গ্রামে ভূ-গর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে কম বেশি বিভিন্ন জলাশয় থাকলেও রাজধানীর মানুষদের পানির একমাত্র মাধ্যম ভূ-গর্ভস্থ। যার জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এভাবে পানির স্তর দিন দিন নিচের দিকে নামতে থাকলে এক সময় শুধু নিরাপদ সুপেয় পানির অভাবেই ঢাকা ছাড়তে বাধ্য হবে লাখো মানুষ। 

মানব জাতির জীবনের অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিরাপদ সুপেয় পানি। আর সেই পানি যদি নিরাপদ ও সহজপ্রাপ্য না হয়,তবে মানব জীবন হয়ে পড়বে বিপন্ন। ধীরে ধীরে সেই বিপন্নতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। এর জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী। 

আমরা যদি এখন থেকেই পানি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন না করি,তাহলে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। যা শুধু কৃষি জমির জন্য হুমকি নয়,মানব জাতির ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমাদের এখন থেকেই পানি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

লেখক : প্রসেনজিৎ কুমার রোহিত (শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ)