আজ হযরত মোজাদ্দেদ আল-ফেসানী (রাঃ) আবির্ভাব দিবস

23

ধর্ম ডেস্ক: ‘আজ হইতে ৪৭১ বছর আগে ঈসায়ী ১৫৬১ খৃষ্টাব্দ, মুতাবিক ৯৭১ হিজরীর ১৪ই শাওয়াল, শুক্রবার দিনগত রাতে ইমামে-রাব্বানী, মুজাদ্দিদ আল-ফেসানি শায়খ আহমদ ফারুকী সিরহিন্দী (রা:) জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর কুনিয়াত ছিল-আবুল বারাকাত, লকব ছিল-বদরুদ্দিন এবং তিনি প্রথম কাইউমরূপে পরিচিত।;

‘একজন প্রসিদ্ধ ওলী, হযরত শায়খ আহমদ জাম (রহ:) প্রায় চার শত বছর আগে এ পূণ্যময় সন্তানের নামকরণ করেন ‘আহমদ’। তাঁর জন্মের সময় তাঁর জননী যে গায়েবী আওয়ায শুনেছিলেন, তা ছিল এরূপ। ফলে নবজাত শিশুর নাম রাখা হয়। ‘শায়খ আহমদ’। হযরত ইমামে রাব্বানী, মুজাদ্দিদে আল-ফেসানী (রাঃ)-এর পিতার নাম হযরত শায়খ আব্দুল আহাদ (রহঃ)। তিনি ছিলেন মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রাঃ)-এর সাতাশ তম (২৭) অধস্তন পুরুষ, এ পর্যায়ে দয়াল নবী রাসূলে পাক (সাঃ) দু‘আ উল্লেখযোগ্য। তিনি দু‘আ করেন : হে আল্লাহ্! উমর ইবনে খাত্তাব অথবা আবু জেহেলের দ্বারা দ্বীন ইসলামকে শক্তিশালী করুন।;

‘দয়াল নবী রাসূলে পাক (সাঃ)-এর এ দু‘আ হযরত উমর ফারুক (রাঃ) কর্তৃক বাস্তবে রূপান্তরিত হয় এবং তাঁর খিলাফতকালে দ্বীন ইসলাম উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে। দয়াল নবী রাসূলে পাক (সাঃ) ওফাত বা শরীয়তের পর্দা নেওয়ার হাজার বছর পর যখন সমস্ত পৃথিবী পুনরায় শিরক, বিদ‘আত ও কুফরীতে ভরপুর হয়ে যায়, তখন হযরত উমর (রাঃ)-এর বংশধর হযরত মুজাদ্দিদে আলফে-সানী (রাঃ) দ্বারা দ্বীন-ইসলাম পুনরায় শিরক-বিদ‘আত থেকে মুক্ত হয়। হযরত মুজাদ্দিদে আফে-সানী (রাঃ)-এর পিতা হযরত শায়খ আব্দুল আহাদ (রহঃ) হিজরী ১০০৭ সালে, ১৭ই রজব ৮০ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। সিরহিন্দ শরীফের উত্তর দিকে তাঁর মাযার রয়েছে।;

শৈশবের কয়েকটি ঘটনা
‘যে বৃক্ষ ভবিষ্যতে প্রকাশ্য মহীরুহে পরিণত হবে, তা যেমন ছোট থাকতেই বোঝা যায়, তেমনি যারা পরিণত বয়সে মহাপুরুষের মর্যাদা লাভ করবেন, তাঁদের মধ্যে ক্সশশব থেকেই বহু অলে․কিক ও বিস্ময়কর ব্যাপার পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং হযরত মুজাদ্দিদে আল্ফে সানী (রাঃ)-এর শৈশবে ও কিছু আশ্চর্যজনক ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। যেমন,তিনি মাতৃগর্ভ থেকেই ‘মাখতুন’ হালতে অর্থাৎ খাতনাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ট হন। উল্লেখ্য যে,দয়াল নবী রাসূলে পাক (সাঃ) ও ‘মাখতুন’ অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করেন।;

‘হযরত মুজাদ্দিদে আলফে-সানী (রাঃ)-এর শৈশবকালীন আরো একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার এই যে, তিনি কখনো নগ্নদেহে থাকতেন না। কখনো তাঁর সতর অনাবৃত হলে, সাথে সাথে তা ঢেকে নিতেন। তিনি সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও হাসি মুখে থাকতেন। তাঁর প্রত্যেকটি আচার-আচরণ ও চাল-চলনের মধ্যে এক বিশেষ নিদর্শন পরিলক্ষিত হতো।;

‘হযরত মুজাদ্দিদে আলফে-সানী (রাঃ) দুদ্ধপোষ্য শিশু থাকাবস্থায় একবার ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তার পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যান্য সকলে তাঁর জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন। এ সময় হযরত শাহ কামাল কায়থিলী (রহঃ) সিরহিন্দ শরীফে আসেন। এখবর পেয়ে শায়খ আব্দুল আহাদ (রহঃ) তাঁর অসুস্থ শিশুকে দু’আ করার জন্য তাঁর কাছে নিয়ে যান। শিশুকে দেখা মাত্রই হযরত শাহ সাহেব (রহঃ) বলেন, আল্লাহ তায়ালা এই শিশুর হায়াত দারাজ করুন। এর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জল। পরিণত বয়সে সে আলেমে হাক্কানী ও আরিফে কামিল হবে এবং আমার মত হাজার হাজার লোক তাঁর আত্মিক তালিমে উপকৃত হবে। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ প্রাপ্তির যে আলো সারা দুনিয়াতে ছড়াবে, তা কিয়ামত পর্যন্ত কখনো নিস্প্রভ হবে না।;

‘এরপর শাহ সাহেব তাঁকে কোলে নিয়ে নিজের পবিত্র জিহবা তাঁর মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেন। শিশু হযরত মুজাদ্দিদে আলফে-সানী (রাঃ) অনেকক্ষণ পর্যন্ত উক্ত জিহবা লেহন করতে থাকেন। অত:পর শাহ সাহেব তাঁর পিতাকে সান্তনা দিয়ে বলেন, চিন্তা করবেন না, ইনশা আল্লাহ্ শিশু আরোগ্য লাভ করবে। আল্-হামদু লিল্লাহ, শিশু কাদেরিয়া তরীকার সব নিয়ামত লাভ করলো। আল্লাহ তায়ালা এর দ্বারা তাঁর দ্বীনের খিদমত নিবেন।;

হযরত মোজাদ্দেদ আল-ফেসানী (রাঃ)-শিক্ষা জীবন
‘হযরত মুজাদ্দিদ আল-ফেসানী (রাঃ) শৈশব অতিক্রম করে কৈশোরে পদার্পন করলে তাঁর শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি পিতা-মাতা বিশেষ যতœ নিতে আরম্ভ করেন। অল্প বয়সে, অতি অল্প সময়ে তিনি কোরআন মযীদ হিফয করেন। এরপর ‘ইল্মে দ্বীনের অনেক কিতাব তিনি তাঁর পিতা শায়খ আব্দল আহাদ (রহঃ)-এর নিকট অধ্যয়ন করেন। সিরহিন্দের অন্যান্য বিখ্যাত আলিমের নিকট থেকে ও তিনি দ্বীনি এলেম হাসিল করেন। হযরত শায়খ ইয়াকুব কাশ্মিরী (রহঃ), হযরত মাওলানা কাজী বাহলুল (রহঃ),স্বনামধন্য তর্কশাস্ত্রবিদ হযরত মাওলানা কামাল (রহঃ) প্রমুখ আলিম ও বুযুর্গানে-দ্বীন তাঁর উস্তাদ ছিলেন।;

‘এলমে তাসাউফ বা মারিফাত সম্বন্ধীয় কিতাব ‘তাসাউফ’, আওয়ারিফুল মাআরিফ, ফুসুসুল হিকাম-প্রভৃতি তিনি সে যুগের শ্রেষ্ঠ উস্তাদদের নিকট পাঠ করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি জাহেরী ও বাতেনী ইলমের এক বিরাট ভান্ডারে পরিনত হন। এরপর তিনি ইলমে দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বিভিন্ন দেশে থেকে দলে দলে শিক্ষার্থী তাঁর নিকট আসতে থাকে এবং দিন-রাত শিক্ষা দেওয়ার কাজ চলতে থাকে। তাঁর দারসে হাদীস ও তাফসীরের হাল্কা সব সময় শরগরম থাকতো। বহু লোক তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ শেষ করে সনদ হাসিল করেন। অবশেষে তিনি ‘ইলমে-জাহেরীতে’ বা জাহেরী-ইলমে’ এরূপ কামালাত অর্জন করেন যে, তিনি মুজতাহিদের দরজায় উন্নীত হন।;

উল্লেখ্য যে ইমামে রাব্বানী, ‘মুজাদ্দিদ আফে-সানী (রাঃ)-এর পূর্ব পুরুষগণ সবাই ছিলেন মারিফাত পন্থী। তাই ‘এলমে মারিফত অর্জনের বিষয়টি তিনি ওয়ারিছ সূত্রেই লাভ করেন। প্রথমে তিনি তাঁর পিতার নিকট থেকে ‘এলমে মারিফাত অর্জন করেন এবং তাঁরই নিকট থেকে চিশতীয়া তরীকার খিলাফত প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি কাদেরীয় তরীকার শ্রেষ্ঠ বুজর্গ হযরত শাহ সিকান্দার (রহঃ)-এর নিকট থেকে এই তরীকার খিলাফত লাভ করেন। সে সময় ‘কুব্রাবিয়া’ তরীকার খুবই প্রসিদ্ধি ও প্রসার ছিল। হযরত মাওলানা ইয়াকুব (রহঃ) ছিলেন এই তরীকার বিখ্যাত বুজর্গ। তাঁর থেকে হযরত মুজাদ্দিদ আলফে-সানী (রাঃ) এই তরীকার খিলাফত লাভ করেন। এসময় তাঁর পিতা শায়খ আব্দুল আহাদ (রহঃ)-এর অন্তিম মূহুর্ত এসে পড়ে। ইন্তিকালের আগে তিনি তাঁর পুত্র হযরত মুজাদ্দিদ আল-ফেসানী (রাঃ) কে তাঁর সমস্ত বাতেনী শক্তি দান করে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান। এভাবে তিনি সে সময় প্রচলিত সমস্ত তরীকার কামালিয়াত হাসিল করেন এবং পিতার নির্দেশ মতো নক্সাবন্দীয়া তরীকায় পরবর্তী কালে কামালিয়াত হাসিল করে ‘এলমে মারিফাতের মহাসাগরে পরিণত হন।;

‘জাহেরী ও বাতেনী এলম হাসিলের পর হযরত মুজাদ্দিদ আল-ফেসানী (রাঃ) বাদশাহ আকবরের রাজধানী আগ্রায় যান। বাদশার সেনা-বাহিনীর অনেকেই তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হন। এ সময় অনেক ‘আলিম তাঁর নিকট থেকে এলেম হাদীস ও তাফসীরের সনদ গ্রহণ করনে।’ এর ফলে তাঁর ‘এলেম ও এলমে হাদীসের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আগ্রায় অবস্থান কালে হযরত মুজাদ্দিদ আল-ফেসানী (রাঃ)-এর খ্যাতি এমন ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, শাহী দরবারের দর্শন ও তর্কশাস্ত্রে বিখ্যাত ‘আলিম আবুল ফযল ও ফৈযী তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মাঝে মাঝে তারা তাঁর মজলিসে আগমন করতেন। বাদশাহ জাহাঙ্গীরকে একবার কেউ জাগ্রত অবস্থায় তার সিংহাসন থেকে তুলে ফেলে দিয়েছে। এতে সে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে অসুস্থ থাকলো। চিকিৎসা করা হল কিন্তু কোন ফল হলো না। অবশেষে একদিন স্বপ্নে সে সাক্ষাৎ লাভ করলো দয়াল নবী রাসূলে পাক (সাঃ) এর,তিনি তাকে সম্বোধন করে এরশাদ করেছিলেন, “হে জালেম! তুমি মুজাদ্দেদে ইসলাম এবং এ যুগের ইমামকে কষ্ট দিয়েছ। এই রোগ সে কারনেই হয়েছে। যদি কল্যাণ চাও তবে তার নিকট দোয়া লও।” বাদশাহ জাহাঙ্গীর জাগ্রত হয়েই হযরত মুজাদ্দেদ আল-ফেসানী (রাঃ)’কে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিল এবং তাঁর নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে সাক্ষাতের আরজী পেশ করে চিঠি লিখল।;

‘হযরত মুজাদ্দেদ আল-ফেসানী (রাঃ) মোলাকাতের জন্যে কয়েকটি শর্ত আরোপ করলেন যা জাহাঙ্গীর মেনে নিল। অতঃপর তিনি গোয়ালিয়রের কারাগার থেকে বিদায় নিলেন। রাজপুত্র শাহজাহান এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁর সম্বর্ধনার জন্যে উপস্থিত হয়। তিনি শাহী মহলে তাশরীফ নেন এবং দোয়া শুরু করেন, আর বাধশাহকে আদেশ দেন, “তুমি তোমার পাপাচারের জন্য তওবা করে আল্লাহ্ তা’আলার দরবারে ক্রন্দন করতে থাকো।” ফলে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বাদশাহ সুস্থ হয়ে উঠলো।;

‘সে হযরত মুজাদ্দেদ আল-ফেসানী (রাঃ)’এর কদমে পড়ে রইলো এবং তাঁর মুরিদদের অন্তর্ভুক্ত হল,তাঁর দরবারে সেজদা প্রথাসহ যাবতীয় মন্দ কাজ বন্ধ করে দিল। একবার হযরত মুজাদ্দেদ আল-ফেসানী (রাঃ) তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন, “ ইনশা আল্লাহ্ জাহাঙ্গীরকে আমার সাথে জান্নাতে নিয়ে যাবো।” মুজাদ্দিদ আল-ফেসানী (রাঃ) এর মিশন ছিলো সম্রাট আকবরের দীনে ইলাহীকে প্রতিহত করে, তদ্বস্থলে ইসলামী আদর্শের পূনঃপ্রতিষ্ঠা। তার প্রচেষ্ঠার ফলে আকবরের পরবর্তী সম্রাটগণ ইসলামের দিকে ধাবিত হতে থাকে। বাদশাহ আলমগীর হচ্ছেন যার উজ্জ্বল নমুনা। বাদশা আলমগীর শুধু একজন সম্রাট বা বাদশাই ছিলেন না বরং একজন বিজ্ঞ আলেমও ছিলেন। মুজাদ্দিদ আল-ফেসানী (রাঃ) তার দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে সিরহিন্দে ১৬২৪ খৃস্টাব্দে তিনি তার মাসুখের সাথে বিলিন হয়ে যান বা ওফাত বরন করেন।; তথ্য সূত্র-[সীরাতে ইমামে রাব্বানী,পৃষ্ঠাঃ১৩১-১৩২]