আত্মপলব্ধি হইতে জিজ্ঞাসাঃ আমি কে…?

18

মোঃ রুবেল হোসাইন :
আমরা কথায় কথায় বলিতেছি আমি, আমরা বা আমার শব্দটি ব্যবহার করিয়া যাচ্ছি। অবশেষে একদিন আমি,আমি বলিতে বলিতে ধরাধাম ছাড়িয়া চলিয়া যাইতেছি। পড়িয়া থাকিতেছে আমার অসাড় দেহ। সবাই তাকে বলিতেছে আমার লাশ। এই লাশ দাফন করিতে সবাই ব্যস্ত হইয়া পড়িতেছে। এই লাশের মধ্যে নিশ্চয় আমি আর নেই। তা হইলে আমি কোথায় ছিলাম আর কোথায় গেলাম,আসলে আমি থকে কি আমার পরিচয় হইতেছে? দার্শনিক সক্রেটিস বলিয়াছেন নিজেকে চেনো। আমাদের দেশের মরমী সাধক ফকির লালন শাহ্ তার গানে বলিতেছেন-‘আপনারে চিনতে পারলে রে যাবে অচেনারে চেনা’।

আরো বলিয়াছেন-‘বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথায় একঘর পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’। তা হইলে আমি কি একটি অচিন অস্তিত্ব! নিজেকেই যদি চিনিতে না পালিাম তাহাইলে সারাজীবন অচিন হিসেবেই থাকিয়া গেলাম, তাহলে অন্যকে চিনিবার চিন্তা করি কীভাবে সেই জন্য সবার আগে নিজেকে চেনা হইলো জরুরি। কিভাবে চেনা যাইবে নিজেকে,এই টা কি আদৌ সম্ভব হইবে খোলা চোখে দেহ ছাড়া কিছুই দেখি না আর বেশি কিছু ভাবতেও পারি না। শুধু এটুকু বুঝা যায়তেছে যে, এই দেহ একটি খাঁচা মাত্র। এটার মধ্যেই অন্য কেউ ‘আমি’ হিসেবে বসবাস করিতেছে। সেই জন্যই দেহ থেকে সেই অচেনা আমি বাহির হইয়া গেলে দেহ হইয়া পড়ে লাশ। সেই লাশ আর নড়া চড়া করিতে পারে না, কোনো কিছুই করিতে পারে না। কবর পর্যন্তও তাহাকে যেতে হয় অন্যের কাঁধে ভর করিয়া। সময় গেলে গলে পঁচে শেষ হইয়া যায়। মাটির দেহ মাটিতে মিশিয়া যায়। সেই জন্য নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, এই দেহ বলিতে আমাকে বুঝায় না বা এই দেহ অর্থ আমি নই। বরং এই দেহ খাঁচার মধ্যে অচেনা এক আমি বসবাস করিতেছি। কে সেই অচেনা আমি সে কি আমার কাছে অচেনা থেকিয়াই যাইবে।

আল্লাহ পাক হযরত আদম (আ.)-এর দেহ প্রথম মাটি,পানি, আগুন ও বাতাস হইতে তৈরি করিয়া রোদে ৪০ দিন শুকাইলেন। সেই দেহ শুকাইয়া ঠন ঠন করলেও তা কিছুই করতে পারেনি। স্বয়ং আল্লাহ পাক যখন সেই অসাড় ঠন ঠনে দেহে স্বীয় রূহ ফুঁকিয়া দিলেন, সাথে সাথে আদম (আ.) দাঁড়াইতে গিয়ে পড়িয়া গেলেন। কেননা, তখনও সেই ফুঁকের প্রভাব সারা দেহে পৌঁছায়নি। এই ফুঁকের প্রভাব সারা দেহে পৌঁছানোর সাথে সাথে আদম (আ.) উঠিয়া দাঁড়াইলেন। তাহা থেকেই শুরু হইলো তাঁহার চলা ফেরা আর চাওয়া পাওয়ার পালা। শুরু হইলো জাগতিক নানান কার্যক্রম। পরবর্তীতে হযরত আদম (আ.)-এর ইচ্ছার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁহার বাম পাশের হাড় হইতে মহান আল্লাহ পাক সৃষ্টি করিলেন তাঁহারই সহধর্মিণী হযরত মা হাওয়া (আ.)-কে। তাঁহাদের দু’জন থেকে জন্মগ্রহণ করিয়া চলেছে মানুষ। পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে মানুষ আসিতেছে আবার চলিয়াও যাইতেছে। তাহারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান পৃথিবীতে জীবিত আছেন প্রায় ৮০০ কোটি মানুষ।

আমি তাহাদেরই একজন। এই থেকে বুঝা যায়তেছে আমি আদম (আ.) ও মা হাওয়ার বংশধর কিন্তু তাহাতেও তো সমাধান হইলো না আমি কে। আমি জানিতে চাচ্ছি আমার ভিতরের সেই অদৃশ্য মানুষটি হইলো কে? মহান আল্লাহ পাক ছিলেন গুপ্ত ধনাগারে। তাঁহার নিজেকে প্রকাশ করার ইচ্ছা জাগ্রত হইলো তিনি মানুষ সৃষ্টির প্রক্রিয়া শুরু করিলেন। সেই কারণেই জাতী নুর বা নুরে মোহাম্মদী হইতে প্রথম আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করিলেন এবং তাঁহাকে সিজদা করার জন্য ফেরেশতাদের আদেশ করিলেন। সব ফেরেশতা হযরত আদম (আ.)-কে সিজদা করিলেও ইবলিশ, যিনি ফেরেশতাদের শিক্ষক ছিলেন তিনি সিজদা করিলেন না। তিনি মহান আল্লাহ পাকের আদেশ অমান্য করিয়াই শয়তানে পরিণত হইলো। হযরত আদম (আ.)-এর থেকে বংশ পরম্পরায় মানুষের আগমন হইতে থাকে।

এতে আমার আগমনের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে কিছু ধারণা হইলো, কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিলাম না, আসলেই আমি যে আদম (আ.)-এর বংশধর, যাহাকে মহান আল্লাহ পাকের আদেশে ফেরেশতাগণ সিজদা করিয়া ছিলেন। আমি সেই ‘আমাকে’ চিনিতে পারিতেছি না। এযে আমার চরম ব্যর্থতা। আমার ভিতরের মূল্যবান আসল আমাকে চেনিাবার যে খুবই প্রয়োজন পরিয়াছে। ইবলিশ আল্লাহর প্রতিনিধি হযরত আদম (আ.)-এর কারণে আল্লাহর অনুগ্রহ হারায়য়াছেন। ফেরেশতাগনদের শিক্ষক হইয়া ঘৃণিত শয়তানে পরিণত হইলেন। সেজন্য সেই থেকেই তাহার আদম (আ.)-এর উত্তরসুরিদের সাথে শত্রুতার শেষ নেই। সে সারাক্ষণ লাগিয়া থাকে আমাদের পিছনে। আমাদের বিপথগামী করিতে সে মহাব্যস্ত হইয়া পরে। সে তো আসল আমাকে চিনিতে দিচ্ছে না। কেননা আমি নিজেকে চিনিতে পারিলে শক্তিশালী হইয়া যাইব। সে আর আমার পিছনে শয়তানি করিতে পারিবে না। সে আমাকে প্ররোচনা দিয়ে সুবিধা করিতে পারিবে না।

আমরা নিজেকে চিনিতে না পারিলে এই শয়তানের হাত হইতে কেহই রক্ষা পাইবোনা। তাহার হাত হইতে রক্ষা পাইতে হইলেও তো আমাদের নিজেদের চেনা দরকার হইবে। সেজন্য জানা দরকার কিভাবে চিনিব আমরা আমাদেরকে। আসলে আমাকে বা নিজেকে চিনিতে পারিতেছি না বলিয়ায় দেহ খাঁচাকে স্বয়ং আমি ভেবে সারাক্ষণ তাহার যত্ন করিতে কতইনা ব্যস্ত হইয়া যায়তেছি। এই দেহ যন্ত্রকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করিতে সব সময় থাকিয়াছি তৎপর। দেহ যন্ত্র সুস্থ, সবল ও সতেজ করিতে পুষ্টিকর খাবার খাইতেছি। এতে দেহ মোটা তাজা হইতেচ্ছে। বারবার হাত পা আর মুখ ধুয়ে ওজু করিয়া পবিত্র হইবার চেষ্টা করিতেছি। এতে দেহ সতেজ ও পরিচ্ছন্ন হলেও আমি কি সতেজ হইতেছি, নাকি পবিত্র হইতে পারিতেছি তাতো হইতে পারিতেছি না। কারণ এ দেহ বলিতে আমাকে বুঝায় না। আমি আমাকে চিনিতে না পারিলে নিজেকে সতেজ করিব কিভাবে আর পরিস্কারই বা হইবে কিভাবে। প্রকৃত গাছের গোড়ায় পানি না ঢালিয়া অন্য জায়গায় পানি ঢালিলে কি গাছ মোটা তাজা হইবে আমি নিজেকে না চিনিলে কাকে খাওয়াতেছি আর কাহারই ওজু করায়তেছি লাশ স্বরূপ দেহের ওজু করাইয়ে আমার ওজু হইতেছে কিনা তাহাও বুঝতে পারিতেছি না।

তবুও আশায় আশায় করিয়া যাইতেছি। আমি যদি আমাকে চিনিতে পারিতাম, তাহা হইলে আমাকে সতেজ ও পরিচ্ছন্ন করিবার কথা ভাবিতাম। আমার জন্য যাহা প্রয়োজনীয় পুষ্টি, তাহা দিতাম আর আমার প্রকৃত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ওজু করাইতাম। সেজন্য যে প্রথমেই প্রয়োজন আসল আমাকে চিনিবার। আমার স্বরূপ উদঘাটন হইতো। আমি আমাদিগকে চিনি না কিন্তু আমার মাঝে আমিত্বের কোনো অভাব নেই। সারাক্ষণ গর্বে মাটিতে পা পড়ে না আমার। কাহাকেও আমার ধারের নিকট ভাবি না। নিজেকে সকলের সেরা ভাবিতে ভালো লাগে। আমি সারাক্ষণ অন্যকে ছোটো করিয়া নিজে বড়ো করিতে পারিলে আনন্দ পাই। কাহারো কোনো সাফল্য আমার সহ্য হইতো না। মনে হয় সব সাফল্য আমার হইবে সেটাই কাম্য। নিজেকে মনে হইতো অনেক ক্ষমতাবান কিন্তু একবারও ভাবিতে পারি না আমি বলিতে যা বুঝিতেছি তা আসলে একটি জ্যান্ত লাশ। এ সব কিছুই সম্ভব হইতেছে আসল আমিকে চিনি না বলিয়ায়। এভাবে ভুলের মাঝে জীবন চলিতে পারে না। কে আমি আর কিজন্য আমার এ পৃথিবীতে আগমন হইলো তা জেনে সেই মোতাবেক চলিতে হইবে। এতো কিছু বুঝিয়াওতো আমার লাভ হইতেছে না। বুঝিতে পারিতেছি না আমাকে আমি চিনিব কীভাবে আমাকে চিনিবার উপায় কী এতো চেষ্টা করিয়াও জানিতে পারিলাম না। এদিকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য কোনোটার প্রাধান্য নেই আমার ভিতর।

আমার ভিতরে রহিয়া চলিতেছে এদেরই রমরমা রাজত্ব। এরা দখল করিয়া নিইয়াছে আমাকে। আমি হয়য়াছি তাআদেরই বশীভূত। আমাকে আয়ত্ব করিয়াছে তারা আমার নামে যাহা কিছু করিয়াছে কিছুই প্রকৃতপক্ষে আমার কর্ম নয়। বরং আমার ভেতরের ছয় শত্রু আমার ঘাড়ে চড়িয়া যত অপকর্ম করিয়া চলেছে। তাহারা জগত সংসারে মজা করিছে আর দায়ভার চাপাইয়া দিতেছে আমার দিগকে। আমি মোটেই বুঝতে পারিতেছি না। এ যে আমার চরম বোকামি হইতেছে। আমি এভাবে আর কতকাল বোকা থাকিব। শত্রুকে না চিনিয়া আর কতদিন তাহার সাথে সংসার করিবো। আমাকে যে তাদের হাত হইতে নিজকে রক্ষা করিতে আমার রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। সেজন্য সত্যিকার আমাকে চিনিতেই হইবে। আমাকে আমার রাজ্যত্বের মহারাজা আমাকে বানাইতেই হইবে। তা না হইলে যে আমার শান্তি লেশ মাত্র থাকিবে না। আমি নিজেকে চিনিতে না পারিয়ায় আসলে আমার প্রকৃত অবস্থা বুঝিতে পারিতেছি না। আমি যদি আমাকে দেখিতে পারিতাম বা বুঝিতে পারিতাম, তাহা হইলে হয়ত চোখে পড়িত আমার জীর্ণ শীর্ণ অবস্থা। আমি যে আমাকে উপযুক্ত খাবার দিতে পারিতেছি না। দিবই বা কিভাবে! কোথায় বা দিব! আমিতো আমাকে চিনিতে পারিতেছি না। মনে হয় আমার মোটা তাজা শরীরের মাঝে জীর্ণ শীর্ণ ‘আমি’ ভুখা আছি। এই আমাকে অভুক্ত রেখে শান্তির সন্ধানে জগতময় ঘুরিয়া বেড়াইতেচ্ছি। কিছুই হইতেছে না তাহাতে। চিন্তা করিয়া কূল কিনারা পাইতেছি না কত অসহায় অবস্থায় অন্ধকারে কাটাইতেছি সেই আমি। সেই অন্ধকার হইতে বাহির হইতে আমার যে প্রকৃত আমাকে চেনিবার খুবই প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে। কীভাবে চিনিব আমি আমাকে! কীভাবে অন্ধকার হইতে উদ্ধার করিব আমি সেই আসল আমাকে। কেউতো আমাকে চিনাইতে পারিল না সেই আসল আমাকে। যাকে জিজ্ঞাস করিলাম সবাই এড়াইয়া চলিয়া গেল। তাহারা ভাবিল আমি কিসব আবোল তাবোল ভাবিতেছি। আমি পাগলামি করিতেছি।

আসলে কি তাহাই আমি যদি আমাকে চিনিতে না পারি তাহা হইলে চিনিলামইবা কী। বিষয়টা নিয়ে আমি অনেকের সাথেই আলাপ করিয়াছি। জানিতে চেষ্টা করিয়াছি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে কার কী ধারণা রহিয়াছে। সবাই নিজ নিজ মত প্রকাশ করিয়া ‘আমি’ বলতে কী বুঝায় তা ব্যাখ্যা প্রদান করিতেছেন। তাহাতে মনে হইয়াছে মানুষ তাহার নিজ অবস্থান হইতে সব কিছু ভাবিতে চেষ্টা করিতেছে। সকলকেই নিজ পরিধির বাহিরে যাইবার সম্ভব হয় নাই। আমাকে যাহারা জবাব দিয়েছেন হয়ত তাহাদের বিষয়টি সম্পর্কে সুষ্পষ্ট ধারণা বোধগম্ম নেই অথবা আমি ঠিকমত তাহাদের প্রশ্ন করিতে পারিনাই। এটাই হইতো বাস্তবতা। আসলে জগৎ সংসারের মোহে পরিয়া আমাদের নিজকে নিয়ে চিন্তা করিবার সময় পাওয়ায় দুষ্কর হইয়াছে। এভাবেই চলিছে পৃথিবী এভাবেই চলিছে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জীবন। নিজেকে ভুলে সংসার করিছে আল্লাহর প্রতিনিধি মানুষ। এই ভাবে আর কত দিন উদাসীন থাকিতে হইবে। আমাকে যে নিজেকে চিনিতেই হইবে। কোথায় যাইব কে বলিতে পারিবে আমি কে? আর দিতে পারিবে আমার পরিচয়। এক পর্যায়ে শুনিতে পারিলাম বিশ্বওলী হযরত খাজাবাবা ফরিদপুরী (কূঃছেঃআঃ) হুজুর কেবলাজানের পবিত্র বাণী ‘আল্লাহর ভেদ মানুষ, আর মানুষের ভেদ আল্লাহ’ আর ‘নিজেকে চিনিলেই আল্লাহকে চেনা যায়’ আত্মশুদ্ধি পথে মাকাম মঞ্জিলের সেই পবিত্র অমূল্য নেয়ামত। তাহাতে বুঝিলাম আমার দেহের ভিতর আত্মা আছে,যাকে অভুক্ত রেখে ষড়রিপুর ইন্ধনে পথ হারাইয়া ফেলিয়াছি নিজ শরীরকে অশুদ্ধ করিয়া ফেলিয়াছি। পরমাত্মা জীবাত্মার প্রভাবে দুর্বল হইয়া পরিয়াছে। সে আত্মার শুদ্ধতা প্রয়োজন হইলো এখন। আপন পীরের দয়ার মাধ্যমে আপন দিলকে জিন্দা বা সতেজ করিবার প্রয়োজন হইলো। মনে হইলো-তাহা হইলে আত্মার শুদ্ধতাই আমার শুদ্ধতা বা পবিত্রতা। আর তাহাতেই আমি অভুক্ত ও জীর্ণ শীর্ণ থেকে সতেজ হইতে পারিব।