ইভ্যালির গিফট ভাউচারেও মিলছে না পণ্য, চুক্তিবদ্ধ ব্যবসায়ীরাও হতাশায়

20

এ.জে.সুজন: ইভ্যালি এমন একটি হায়-হায় কোম্পানি যার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোনকাজই হয় না। লোকঠকানো যার মূল পেশা। এত দিন শুধু একশ্রেণির গ্রাহকের অভিযোগ ছিল ক্রেতার অর্ডার করা পণ্য দিতে গড়িমসি, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা না দেওয়া সহ নানান অভিযোগ। ডিজিটাল কমার্স বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির বিরুদ্ধে এবার নতুন অভিযোগ, তাদের গিফট ভাউচারেও মিলছে না পণ্য। এখন ইভ্যালির সাথে চুক্তিবদ্ধ ব্যবসায়ীরাও হতাশায়।

সম্প্রতি ইভ্যালির গিফট ভাউচারে কেনাকাটার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। ইভ্যালির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বেশকিছু পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান (মার্চেন্ট) ভাউচারের বিপরীতে গ্রাহকদের পণ্য দিচ্ছে না। ইভ্যালির দেওয়া ভাউচার দিলেও প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের বলছে ইভ্যালির কাছ থেকে পণ্য বুঝে নিতে। কারণ, ভাউচারের বিপরীতে ইভ্যালি তাদের পাওনা পরিশোধ করেনি। আবার চেক দিলেও ওই চেক ব্যাংকে জমা না দিতে বলছে ইভ্যালি। কারণ, তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে টাকা নেই।এত দিন মূল অভিযোগ ছিল, গ্রাহকদের একটা অংশ সময়মতো পণ্য পাচ্ছেন না।

এমনই একটি প্রতিষ্ঠান দেশি পোশাকের ব্র্যান্ড ‘রঙ বাংলাদেশ’। গতকাল বুধবার দেশি পোশাকের ব্র্যান্ড ‘রঙ বাংলাদেশ’এক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে, ‘আপনাদের কেনা গিফট ভাউচারের পেমেন্ট ইভ্যালি আমাদের পরিশোধ না করায় ভাউচারটি এই মুহূর্তে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভবিষ্যতে পেমেন্ট পরিশোধ করলে এই ভাউচার আপনি অবশ্যই ব্যবহার করে কেনাকাটা করতে পারবেন।’ এ অবস্থায় ইভ্যালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা জানিয়েছে ‘রঙ বাংলাদেশ’।

রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৌমিক দাসের সাথে কথা বলে জানা যায়, আমরা নিরুপায় হয়েই এমন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছি। অনেক টাকা ইভ্যালিতে আটকে রয়েছে। ইভ্যালি যে গিফট ভাউচারগুলো কিনেছিল, সেগুলো নিয়ে বিশেষ সমস্যায় পড়েছে তারা। গিফট ভাউচার নিলেও সিংহভাগ ক্ষেত্রেই টাকা পরিশোধ করেনি ইভ্যালি। অনেকবার যোগাযোগ করলেও ইভ্যালি এ ব্যাপারে সন্তোষজনক উত্তর দেয়নি। এখন ক্রেতা ও রঙ বাংলাদেশ উভয়ই ভুক্তভোগী। এখন বাধ্য হয়েই গিফট ভাউচার ব্যবহার করে কেনাকাটা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে নানা অনিয়মের কারণে ইভ্যালিসহ ১০টি অনলাইন মার্চেন্টে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ডের লেনদেন স্থ‌গিত করেছে বেশকিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক। এর মধ্যে ডাচ বাংলা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এম‌টি‌বি), ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং ঢাকা ব্যাংক এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পাশাপাশি ইউসিবি ও সিটি ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের এসব অনলাইন মার্চেন্টে লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

এর আগে ইভ্যালির সম্পদের চেয়ে ৬ গুণ বেশি দেনা রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের করা এক প্রতিবেদনে উঠে আসে। প্রতিবেদনে উঠে আসে, ইভ্যালির মোট দায় ৪০৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম নিয়েছে ২১৪ কোটি টাকা, আর মার্চেন্টদের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিয়েছে ১৯০ কোটি টাকার। স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কমপক্ষে ৪০৪ কোটি টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা। কিন্তু সম্পদ আছে মাত্র ৬৫ কোটি টাকার।

এছাড়া গ্রাহক ও মার্চেন্টদের কাছ থেকে গত ১৪ মার্চ পর্যন্ত ইভ্যালির নেওয়া অগ্রিম ৩৩৯ কোটি টাকার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এ টাকা আত্মসাৎ বা অবৈধভাবে অন্যত্র সরিয়ে ফেলার আশঙ্কা রয়েছে।

ইভ্যালির ওপর করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে ৪ জুলাই অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের চার প্রতিষ্ঠানকে চিঠি পাঠিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠান চারটি হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

এরপর দুদকের পক্ষ থেকে ইভ্যালির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরীন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রাসেলের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়।

এদিকে অনিয়ন্ত্রিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মনীতির মধ্যে আনতে গত ৪ জুলাই দেশে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা জারি করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, ক্রেতা-বিক্রেতা একই শহরে অবস্থান করলে ক্রয় আদেশ দেওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে, ভিন্ন শহরে থাকলে ১০ দিনের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে মূল্য পরিশোধের ১০ দিনের মধ্যে ক্রেতার পুরো টাকা ফেরত দিতে হবে। কোনো অবস্থায়ই গ্রাহকের পণ্য বা সেবা বুঝিয়ে না দিয়ে বিক্রয় মূল্য পাবে না জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পেমেন্ট নির্দেশনা জারি করে।