একুশে বইমেলা, বাঙ্গালী জাতিসত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য অংশ

6

ইমরান হুসাইন : মেলা মানেই বিচিত্র মানুষের মেলবন্ধন। বিশেষ কোনাে উপলক্ষ্যে অস্থায়ী ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিসরে গ্রামে-গঞ্জে অথবা শহর পর্যায়ে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। কেবল পণ্য ক্রয়-বিক্রয় নয়, আমােদ-প্রমােদ ও বিনােদনেরও এক ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম এই মেলা। ধর্মীয় পালা- পর্বণ অথবা একটি জাতিসত্তার গৌরবময় অর্জন কিংবা বিশেষ দিন বা লগ্নকে উপলক্ষ্য করে আয়ােজিত হয় এই মেলা। যা উৎসবপ্রিয় বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের সঙ্গে একান্তভাবে সম্পর্কিত। বাঙালির সাংবৎসরিক জীবনপরিসরে উদযাপিত হরেক রকম মেলার মধ্যে যেটি সৃজন ও মননের দাবি নিয়ে আসে সেটি হচ্ছে বইমেলা। এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রাণে প্রাণে বয়ে যায় প্রাণের মেলা।

প্রাচীন ভারতের বিদগ্ধ মহলে বইয়ের কদর থাকলেও তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিল কিনা তা জানা যায় না। মূলত বইমেলার রেওয়াজটি সর্বপ্রথম গড়ে উঠেছিল প্রাচীন ইউরােপে। খ্রিষ্টজন্মের পূর্বে, প্রাচীন পাশ্চাত্য সভ্যতার উৎসভূমি গ্রিসে কবি দার্শনিকদের রচনা সর্বসাধারণের কাছে প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এর ধারাবাহিক ইতিহাস জানা যায় না। ইতিহাসের একটি বিশেষ পর্যায়ে, ১৪৬২ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বইমেলার আয়ােজন করা হয়ে থাকে। অতঃপর সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর দেশে দেশে তা ছড়িয়ে পড়ে।

বই হচ্ছে জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মনের চোখ বাড়ানাের জন্য প্রয়ােজন প্রচুর বই পড়া। অথচ বাঙালি এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি বরাবরই ছিল উদাসীন। বিদ্যোৎসাহী, সংস্কৃতিবান বাঙালি বিভিন্ন সময়ে বিত্তবানদের অর্থানুকূল লাইব্রেরি গড়ে তুললেও কখনাে বইমেলার আয়ােজন করেছে এমন তথ্য জানা যায় না। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলাকে কেন্দ্র করে মর্মন্তুদ ও শােকাবহ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির জাতীয় জীবনে যে আত্মপরিচয়ের বীজ উপ্ত হয়, তার রক্তাক্ত উজ্জীবন ঘটে ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের গর্বিত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি ১৯৭১ সাল থেকেই হ্রাসকৃত মূল্যে তাদের প্রকাশিত বই বিক্রির ব্যবস্থা করে। কিন্তু সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালে বাংলা একাডেমি বইমেলার উদ্যোগ গ্রহণ করে সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ‘মুক্তধারা’। এই উদ্যোগ প্রসারিত করে ‘আহমদ পাবলিশিং হাউস’, ‘নওরােজ কিতাবিস্তান এবং “চলন্তিকা বইঘর। এর ফলে বইপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চালিত হয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবিতে আত্মদানকারী মহান শহিদদের স্মরণ করে বাংলা একাডেমি ১৯৭৮ সাল থেকে একাডেমি প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলার আয়ােজন করে। বর্তমানে এই বাংলা একাডেমি হয়ে উঠেছে আমাদের শুদ্ধ সাংস্কৃতিক কর্মক্রিয়ার প্রধান ক্ষেত্র, এবং বাংলা একাডেমিতে ফেব্রয়ারি মাসব্যাপী উদযাপিত বইমেলা হয়ে উঠেছে আমাদের গর্বিত মননশীল ঐতিহ্যের অংশ।

প্রতিবছরেই ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে বইমেলা শুরু হয়। যা একমাস ব্যাপি চলতে থাকে।বইমেলা ঘিরে লেখক ও পাঠকদের মনে এক অন্য রকম নেশা কাজ করে।বই প্রেমিকেরা মেতে উঠে নতুন উচ্ছাসে।বইমেলাতে দেখা মেলে দেশ বরেণ্য কবি, সাহিত্যেক,লেখক ও গুনিব্যক্তিদের।করোনাভাইরাসের প্রভাবে সেই ফেব্রুয়ারী মাসের ঐতিহ্যবাহী মেলাটি শুরু হয়েছে মার্চ মাসের ১৮ তারিখ থেকে। বইমেলা ঘিরে একবারও অনেক ভিড় লক্ষ্য করলেও নেই আগের মতো সেই আমেজটা।তবুও প্রানের মেলা বই মেলা ঘিরে আবেগ উদ্দীপনার কমতি নেই কোন।মেতে উঠেছে লেখক ও পাঠকরা প্রানের মেলা বই মেলায়।প্রতিবছর বইমেলার পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে, বইপ্রেমী দর্শনার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে এবং স্থানসংকুলান হয়ে উঠছে অসম্ভব। একাডেমির স্বল্প-পরিসর আয়তনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বইপ্রেমীর স্থান সংকুলান আর সম্ভব নয়। তাই একাডেমি-সংলগ্ন সােহরাওয়ার্দি উদ্যানের অংশবিশেষ অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে বইমেলা আয়ােজিত হলে দর্শক-পাঠক অনেক বেশি নির্ভার হয়ে বইমেলা উপভোগ করতে পারবেন বলে সেখানে আয়োজন করা হয়।

বাঙালির জাতীয় জীবনে বইমেলার প্রভাব অপরিসীম। এই মেলাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে একটা উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, ফলে সারা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে বাঙালি জনমানসে বাংলা ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে তৈরি হয় ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা।একুশে বইমেলা দিনে দিনে হয়ে উঠেছে বাঙালি জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের মিলনক্ষের এটি। বইবিমুখ বাঙালি জাতিকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে এই মেলা। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছে মননশীল, সুসংস্কৃত ও রুচিঝদ্ধ। প্রকাশকরা ভালাে ভালাে গ্রন্থ প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছে এবং সৃজনশীল লেখকেরা কালজয়ী গ্রন্থরচনায় উৎসাহবােধ করছে। বইপ্রেমী মানুষের মিলনমেলায় এসে বইবিদ্বেষী মানুষও বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর ফলে জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক মান দিনে দিনে হয়ে উঠছে সমৃদ্ধ। মানুষের নৈতিক চেতনাও উন্নত হয়ে উঠছে তারা ভালাে-মন্দের ফারাক করতে শিখছে। তদুপরি সমস্যাসংকুল নগরজীবনে এই বইমেলা হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের নির্মল ও শুদ্ধ বিনােদনের উৎস। তাই বাঙালি জাতিসত্তার মননচেতনার উত্তরণে বইমেলার গুরুত্ব অশেষ।

যেকোনাে জাতিসত্তার মননশীল চিন্তা-চেতনার বিকাশে বই এবং বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। একটি জাতিগােষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মান নিরূপণে এটি একটি নির্বিকল্প মাধ্যম। তাই দেশ এবং উপজেলা পর্যায়ে় বইমেলার আয়ােজন অত্যাবশ্যক। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি ভাবে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দেশে চলমান মহামারী করোনাভাইরাসের চলমান আতংকে উপেক্ষা করে সচেতনতা ও স্বাস্থবিধি মেনে বাঙ্গালী মেতে উঠুক প্রাণের মেলা বইমেলাতে।