ক্ষতিকারক অনলাইন গেমে শিশু-কিশোররা

16

শৈশব-কৈশোরের একটি স্মৃতিকথা মনে পড়ে। আমাদের গ্রামের মূলসড়ক থেকে বাড়ি পৌঁছাতে পায়ে চলা সরু রাস্তাটি ছিল জঙ্গলে পূর্ণ, তার মধ্যে ছিল একটি পুরনো গাব গাছ। গ্রামের মানুষের একটি সরল বিশ্বাস ছিল, সব গাব গাছেই ভূত থাকে। ভূতেরা মাঝে মাঝে কান্নাকাটি করতো, এটা মানুষে শুনতে পেত।

এমন একটা গাব গাছের নিচ দিয়ে যখন দিনে-দুপুরেও আসা-যাওয়া করতাম তখন গা ছমছম করে উঠতো, হাতের পশমগুলো দাঁড়িয়ে যেত। সন্ধ্যার পরতো একা একা কখনোই ওই পথ মাড়াতাম না। তরুণ-যুবা বয়স পেরিয়ে এখন পৌঢ় তালিকায় উঠে যাচ্ছে নাম, অথচ গ্রামে গেলে ওই গাব গাছের নিচ দিয়ে আমি এখনো যেতে পারিনা। এটি একটি সহজ সত্য কথা।

কথাটি মনে পড়ল, একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের একটি মন্তব্যের কারণে। কিছুদিন আগে তিনি একটি সংবাদপত্রে লিখেছিলেন, ইন্টারনেটে সহিংস সিনেমা, গেম, কার্যকলাপ যে শিশুরা দেখে, তাদের মধ্যে সে স্মৃতিগুলো গেঁথে যায়। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীকে তাদের কাছে ভয়ঙ্কর মনে হয়। শিশু-কিশোররা সহিংস হয়ে ওঠে।

এটা বাস্তব সত্য যে, দুনিয়ার যে কোনো অঞ্চলের শিশু-কিশোরই হোক না কেন, সহিংস সিনেমা, গেম ইত্যাদির চরিত্রগুলোতে সে মিশে যায়। পরবর্তীতে শিশু-কিশোর নিজেই সে চরিত্ররূপে আবির্ভূত হয়। কারণ বাল্যস্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আমাদের কিশোর বয়সের ভূতটা এখন মোবাইলে ঢুকে পড়েছে। অনেক শিশু-কিশোরই রাতে ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠে। ঘুম থেকে জাগলে ওরকম সহিংসতা, দুঃস্বপ্নের মতো তাকে পেয়ে বসে। গেমের চরিত্রটার কর্মকাণ্ড এখন বাস্তব জীবনে তারই ঘটাতে ইচ্ছে করে। এ ভূত এখন আমাদের সর্বত্র ঘরে ঘরে জনে জনে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

সমস্যাটা শেষ পর্যন্ত আমাদের মহান হাইকোর্ট পর্যন্ত উঠে এসেছে। এবছর (২০২১) ১৬ই আগস্ট দেশের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পাবজি, ফ্রিফায়ার, লাইকি, বিগো লাইভ, প্লাস অব প্ল্যানস, মাইনক্রাফট, কাউন্টার স্ট্রাইক, গ্লোবাল সাইন্স, কল অব ডিউটি, ওয়ার জোন ইত্যাদির মতো গেম ও অ্যাপের লিংকসহ ইন্টারনেট গেটওয়ে নিষিদ্ধ বিষয়ে রুল জারি করেছেন মাননীয় হাইকোর্ট। এর সঙ্গে জড়িতদের লেনদেন ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিয়েও হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দান করেছেন।

কেন এমন একটি বিষয় হাইকোর্ট পর্যন্ত উঠে এল! আমরা অভিভাবকরা কী করছিলাম! করোনাকালে অনলাইন ক্লাস করার জন্য আমরা সন্তানদের স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিলাম! একথা সত্য নয়। করোনার অনেক আগেই আমাদের দেশের কিশোরদের হাতে হাতে মোবাইল ছিল। কোনো এক অভিভাবক বাহাদুরি দেখাতে তাঁর সন্তানের হাতে মোবাইল তুলে দিয়েছিলেন, সেটা দেখে ঐ কিশোরের বন্ধুরাও তাদের বাবা-মার কাছে মোবাইল চাইল। এভাবে ছড়িয়ে পড়লো হাত থেকে হাতে মোবাইল-স্মার্টফোন কতকিছু। অনেক অভিভাবক শিশু-কিশোরকে খাওয়াতে সহজ হবে ভেবে প্রথম জীবনেই মোবাইলে গেম ছেড়ে দিয়েছে। এখন বাচ্চা এটা হাতে না পেলে খেতেই চায় না।

একটা ছোট্ট অভিজ্ঞতার কথা বলি। মাঝেমাঝেই অপরিচিত নাম্বার থেকে ‘কল’ আসে। ‘কল ব্যাক’ করলে অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘স্যরি, বাচ্চাটা মোবাইল নিয়ে খেলা করছিলো, হয়তো অসাবধানে লেগে গেছে’। এটা কি অভিভাবকের একটা দায়িত্বশীল কথা হলো! কেন আমরা এমন করে শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছি! এ থেকে বিপদও আসতে পারে।

আমাদের দেশের কী পরিমাণ মানুষ এ বিপদের মধ্যে আছেন, তার একটা পরিসংখ্যান নেয়া যায়। ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগ বাংলাদেশে শিশু, কিশোর ও তরুণদের উপর একটি জরিপ করেছিল। তাদের সে প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশে ২ কোটি ৬০ লাখ ছাত্র-তরুণ বিভিন্ন প্রকার ডিজিটাল গেম নিয়মিতই খেলে থাকে। এখন বিশ্বের কী অবস্থা!

২০২১ সালে বিশ্বজুড়ে অনলাইন গেমিংয়ের বাজার নাকি আমাদের দেড় লাখ কোটি টাকার সমান হবে। এ ভবিষ্যত বাণীটি করা হয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড নামক ডিজিটাল গণমাধ্যম থেকে। এসব গেমের বাজার নিয়েও গবেষণা করার অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে একটি নিউজুর। তারা বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় অনলাইন গেমের বাজারে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে আছে। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবকদের মধ্যে অনলাইন গেম আসক্তি মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক আগে থেকেই অনলাইন গেম আসক্তিকে একটি মানসিক রোগ বলে ঘোষণা করেছেন। তাহলে এ রোগে বাংলাদেশের শিশু-কিশোররা ক্ষতিগ্রস্থ তালিকায় খুবই নাজুক অবস্থানে রয়েছে।

অনলাইন গেমিং-এ অস্ত্রের নানারকম ব্যবহার, তড়িৎ গতিতে প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান, বোমা মেরে ত্রাস সৃষ্টি করে মজা দেখা ইত্যাদি সহিংস আচরণ শিশু-কিশোরদের মনে ও মগজে স্মৃতি হিসেবে গেঁথে যাচ্ছে। আর পরবর্তী জীবনে এর প্রভাবে তারমধ্যে বেড়ে উঠে এক সহিংস জগৎ, যার থেকে শিশু-কিশোররা আর বের হয়ে আসতে পারে না। তখন প্রচলিত সমাজের নানা সমস্যা সমাধানে তার মধ্যে জাগরুক হয় এ সহিংস আচরণ, যেখানে সে জড়িয়ে নিজেকেই বিপদে ফেলে দেয়। তাদের বিপদ আমাদের সমাজেও প্রতিফলিত হয়, এভাবে গোটা বিশ্ব আজ অনলাইন গেমিংয়ের কালো থাবায় আক্রান্ত।

সমাজের প্রতিটি মানুষ, সজ্জন, চিন্তাবিদ, গবেষক সকলের তাই দায়িত্ব রয়েছে যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া, দায়িত্ব পালন করা। মা-বাবা-অভিভাবকদের দৃঢ়তার সাথে ‘না’ বলতে হবে সন্তানকে। মোবাইল ফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং অনলাইন গেমের খারাপ দিকগুলো সরাসরি তুলে ধরতে হবে সন্তানদের সামনে। আমাদের সন্তানরা তা অবশ্যই মানবে।

লেখক: ড. মোহাম্মদ হাননান, পিআইডি- শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম (৫ম পর্যায়) প্রকল্প কার্যক্রম।