জঙ্গি সংগঠন ’আনসার আল ইসলাম’ এর আধ্যাত্মিক নেতা গুনবি গ্রেফতার

26

নিজস্ব প্রতিবেদক: র‌্যাব ম্যানডেটের আলোকে প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে র‌্যাব জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার এবং হলি আর্টিজান পরবর্তী প্রায় দেড় হাজার জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে। পূর্ববর্তী ধারাকে সমুন্নত রেখে র‌্যাব বহুমূখী কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে জঙ্গিবাদ দমন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। শুধুমাত্র অভিযান নয়; জঙ্গিবাদ বিরোধী জনমত গড়তে ও জনসম্পৃক্ততা অর্জনে র‌্যাব ব্যাপক প্রচার প্রচারণা করেছে। অন্য দিকে আভিযানিক প্রক্রিয়ায় গ্রেফতার এর পাশাপাশি জঙ্গিদের অর্থের উৎস এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রাপ্তি বন্ধ করতেও র‌্যাবের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া র‌্যাব জঙ্গি আত্মসমর্পণে বিশেষ উদ্যোগ “র‌্যাব ডি-রেডিক্যালাইজেশন ও রিহ্যাবিলিটেশন” কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। র‌্যাব জঙ্গিদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবতর্নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে জঙ্গি বিরোধী উদ্যোগ আরও সুসংহত করেছে। বর্ণিত কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কয়েকজন উগ্রবাদী মতাদর্শ বা দর্শন পরিবর্তনকারী উগ্রবাদী স্কলার সম্পর্কে তথ্য পায় র‌্যাব। যাদের বক্তব্য ও মোটিভেশনের মাধ্যমে অনেকেই জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়েছে বলে জানা যায়। র‌্যাব এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ জুলাই ২০২১ তারিখ ২৩৩০ ঘটিকায় র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা এবং র‌্যাব-৪ এর অভিযানে রাজধানী ঢাকার শাহ আলী থানাধীন বেড়িবাধ সংলগ্ন এলাকা হতে আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান @ গুনবি (৩৬), গ্রাম-গুনবতি, থানা-চৌদ্দগ্রাম, জেলা-কুমিল্লা’কে গ্রেফতার করে। উক্ত অভিযানে উদ্ধার করা হয় উগ্রবাদী পুস্তক ও লিফলেট।

গ্রেফতারকৃত মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান @ গুনবি (৩৬)’কে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত অধ্যয়ন করার পর মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সে ২০০৮ সালে জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুর হতে তাইসির দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে। অতঃপর সে ঢাকাসহ কুমিল্লা, নোয়াখালী, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সজারের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়। পাশাপাশি ধর্মীয় মতাদর্শের বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়। সে ২০১০ সাল হতে ওয়াজ শুরু করে। অতঃপর সে ২০১৪ সাল হতে ধর্মীয় বক্তব্যে উগ্রবাদীত্ব প্রচারে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। এছাড়া সে ধর্মীয় পুস্তকের ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা যায় যে, সে প্রথমে হুজি (বি) সাথে যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে জসিম উদ্দিন রহমানির সাথে তার পরিচয় সূত্রে ঘনিষ্ঠতা তৈরী হয়। উক্ত ঘনিষ্ঠতার সূত্রে সে আনসার আল বাংলা টিম (আনসার আল ইসলাম) এর সাথে সম্পৃক্ত হয়। জসিম উদ্দিন রাহমানি গ্রেফতারের পর সে উগ্রবাদীত্ব প্রচারক হিসেবে নিজেকে অধিষ্ঠিত করে।

গ্রেফতারকৃত জঙ্গি মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান আনসার আল ইসলামের দাওয়াত ও প্রশিক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসায় খন্ডকালীন/অতিথি বক্তা বা দীর্ঘ মেয়াদী শিক্ষকতা বা পরিচালনা পর্ষদের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উক্ত মাদ্রাসায় সম্পৃক্ত হয়ে জঙ্গিবাদের বিস্তৃতি ঘটিয়ে থাকে বলে জানা যায়। উক্ত মাদ্রাসা সমূহে সে উগ্রবাদী বক্তব্য প্রদান ও একই সাথে উগ্রবাদী পুস্তকাদি বিস্তারের ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের আগ্রহী করে তোলে। পরবর্তীতে সেই উগ্রবাদী পুস্তকগুলো সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষকদের উগ্রবাদী লেকচার প্রদানে উদ্বুদ্ধ ও উগ্রবাদী পুস্তিকা তৈরী, প্রকাশ, প্রণয়নে সহায়তা করে থাকে।

জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ ও আত্মঘাতি জঙ্গি সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশে দর্শন বা মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন একটি আবশ্যিক বিষয়। গ্রেফতারকৃত মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান একজন দর্শন পরিবর্তনকারীর ভূমিকা পালন করে থাকে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। সে আনসার আল ইসলাম (এবিটি) এর পক্ষে অন্যতম একজন দর্শন পরিবর্তনকারী। দর্শন পরিবর্তনের কৌশল সম্পর্কে গ্রেফতারকৃত মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান জানায় যে, বর্ণিত কার্যক্রম গোপন আস্থানায় বিশেষ প্রশিক্ষণ মাধ্যমে দেওয়া হয়। যেখানে প্রশিক্ষণার্থীরা আত্মীয়-স্বজন, পরিবার বন্ধু বান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন (ওংড়ষধঃব) থাকে। প্রশিক্ষণার্থীদের বাহিরের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান ইত্যাদি হতে দূরে রাখা হয়। অতঃপর তাদের মস্তিকে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে ভয় ভীতি তৈরী ও স্বাভাবিক জীবন সম্পর্কে বিতৃষ্ণা জাগ্রত করা হয়ে থাকে। ফলে প্রশিক্ষণার্থীদের ভিতর আবেগ, অনুভূতি, বুদ্ধিমত্তা, পারিবারিক বন্ধন, বিচারিক জ্ঞান ইত্যাদি লোপ পায়। এভাবে কোমলমতিদের নৃশংস জঙ্গি হিসেবে গড়ে তোলা হয়। উল্লেখ্য, গত ০৫ মে ২০২১ তারিখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ঢাকা হতে গ্রেফতারকৃত জঙ্গি আল সাকিব (২০), সিরাজগঞ্জ এর মতাদর্শ পরিবর্তন ও পরবর্তীতে তাকে আত্মঘাতি পন্থায় উদ্বুদ্ধ করণে গ্রেফতারকৃত মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে জানা যায়।

গ্রেফতারকৃত জঙ্গি মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান একজন আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা। সে নিজ পেশার আড়ালে জঙ্গিবাদ প্রচার করে থাকে। সে একাধিক ধর্মীয় সংগঠন/প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। সংগঠন/প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিতর তার ঘনিষ্টদের মধ্যে বেশ কয়েকজন জঙ্গিবাদ সংশ্লিষ্টতায় ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়েছে। তন্মধ্যে সাইফুল ইসলাম, আব্দুল হামিদ, আনিছুর রহমান ও হাসান উল্লেখযোগ্য। সংগঠনের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী মতাদর্শদের প্রচারে সে “ছায়া সংগঠন” পরিচালনা করত। যাদেরকে “মানহাজী” সদস্য বলা হয়। উক্ত সদস্যরা সংগঠনের ভিতরে জঙ্গি সদস্য তৈরি করত। এছাড়া বিভিন্ন ইস্যুতে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিত। সে “দাওয়াত ইসলাম” এর ব্যানারে অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ করে জঙ্গিবাদে অন্তর্ভুক্তির বিশেষ উদ্যেগ গ্রহণ করে। এ ক্ষেত্রে তারা বিশেষ করে “মনস্তাত্ত্বিক অনুশোচনা” জাগ্রত করার কৌশল অবলম্বন করে। এছাড়া সে মাহফিলের আড়ালে জঙ্গি সদস্য রিক্রুট করত।

গ্রেফতারকৃত মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান জানায় যে, সে গত মে ২০২১ মাসের প্রথম দিকে গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায়। সে কুমিল্লা হতে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে গমন করে এবং দূগর্ম এলাকায় আত্মগোপন করে। জুন ২০২১ এর শেষের দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের প্রেক্ষিতে সে পুনরায় স্থান পরিবর্তন করে বান্দরবানে অবস্থান নেয়। সেখানে ২-৩ দিন অবস্থান করে। পরবর্তীতে সে লক্ষীপুরের চর গজারিয়া ও চর রমিজে ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করে বেশ কয়েকদিন অতিবাহিত করে। আবারও সে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা টের পেয়ে সে স্থানও ত্যাগ করে। অতঃপর সে উত্তরবঙ্গে আত্মগোপনের ও প্রয়োজনে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করে।

গ্রেফতারকৃত জঙ্গি মাহমুদ হাসান গুনবি @ হাসান বাংলাদেশকে উগ্রবাদী রাষ্ট্র পরিনত করতে উগ্র মতাদর্শ প্রচার, পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের সাথে বেশ কয়েকবার গোপন বৈঠক করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সুযোগ সন্ধানের অপপ্রয়াস চালিয়েছে বলেও জানায়। গ্রেফতারকৃতের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।