জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করতে হবে

35

ইমরান হুসাইন : একটি পরিবার,সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম উপাদান হলো জনসংখ্যা।আর একটা রাষ্ট্রের জন্য এই জনসংখ্যা কখনও মঙ্গলজনক আবার কখনও হুমকি স্বরুপও হয়ে উঠতে পারে।যেটা বিবেচিত হয় একটা দেশের সার্বিক সক্ষমতার উপর।বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ।যার জনসংখ্যা এদেশের উন্নয়নের পথে হুমকি হিসাবে দাড়িয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের অন্যান্য দেশ গুলোতেও পূর্বের থেকে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জনসংখ্যার হার অত্যাধিক পরিমানে বেশি।যার প্রভাবে শুধুমাত্র সেই দেশই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে না। সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে পুরো বিশ্ব বাসিকে।

কোন দেশের মোট জনসংখ্যা যখন সেই দেশের আয়তনের তুলনায় অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনে ব্যাঘাত ঘটে তখন সেই জনসংখ্যাকে অতিরিক্ত জনসংখ্যা বলা হয়। একটা দেশের মোট জাতীয় সম্পদের তুলনায় যখন জনসংখ্যার পরিমান বেড়ে যায় তখন জাতীয় ভাবে নানাবিধ সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতার স্বীকার হতে হয়।

এক্ষেত্রে সে দেশের জনসংখ্যা দেশটির জন্য অভিশাপ হয়ে দাড়ায়।আবার যখন একটা দেশের মোট জনসংখ্যার থেকে দেশের জাতীয় সম্পদ ও আয়তনের তুলনায় মোট জনসংখ্যা কম হয়ে থাকে তখন সেটা সেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয়ে থাকে।বিশ্বের অধিকাংশ দেশ গুলোতেই এখন অধিক জনসংখ্যা বিরাজমান। যা কোন দেশের উন্নতির অন্তরায়।আবার যেসব দরিদ্র দেশ গুলোতে জনসংখ্যার ঘনত্বের পরিমান অধিক সে সমস্ত দেশ গুলোতে সার্বিক দিক থেকেই নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলতে হয়।

প্রতিবছরই জনসংখ্যার পরিমান দ্রুত গতিতে বেড়েই চলেছে।অতিরিক্ত জনসংখ্যা কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যাগুলো সবাইকে জানানো এবং তার গুরুত্ব সকলের কাছে তুলে ধরতে প্রতি বছর ১১ জুলাই বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল দেশেই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে উন্নীত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ইউএনডিপির গভার্ন্যান্স কাউন্সিল প্রতি বছর এই দিনটিকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করে আসছে।যেনো বছরের একটি দিনেও বিশ্বের সকল মানুষের অতিরিক্ত জনসংখ্যার কুফলগুলো জানতে পারে ও সচেতন হতে পারে।অতিরিক্ত জনসংখ্যার প্রভাবে ব্যাক্তি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় যেমনঃঅপুষ্টি, অপর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ, বেকারত্ব, চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা,জনসংখ্যার ঘনত্ব,মাথাপিছু আয় ইত্যাদি। যেখানে সকল সমস্যার মূলে রয়েছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, সম্প্রতি দেশের মানুষের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বেড়ে হয়েছে ৭২ দশমিক ৬ বছর। পুরুষের ক্ষেত্রে গড় আয়ুস্কাল ৭১ দশমিক ১ বছর এবং নারীদের ৭৪ দশমিক ২ বছর। বাংলাদেশের জনসংখ্যা (১ জানুয়ারি ২০২০) বেড়ে হয়েছে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৮ কোটি ৩৮ লাখ এবং নারী ৮ কোটি ৩৬ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস-২০১৯’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। দেশের মোট জনসংখ্যা এবং তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা জানতে প্রতি দশবছর পর পর সারাদেশে আদম শুমারি করা হয়। আর এই তথ্যের সাথে সমন্বয় করতে প্রতিবছর নমুনা সংগ্রহ করে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বিবিএস।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আরো একটি প্রতিবেদনে আসে,১৮৬০ সালে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২ কোটি। ১৯৪১ সালে যা বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২০ কোটি। অর্থাৎ ৮০ বছরে বাংলাদেশে মাত্র দুই কোটি জনসংখ্যা বাড়ে। আবার ১৯৬১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৫ দশমিক ৫২ কোটি যা ১৯৯১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ১৫ কোটি। ত্রিশ বছরে দ্বিগুণ জনসংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০১২ সালে দেশের মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ২৭ লাখ। ২০১৬ সালের ১ জুলাইতে এই জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৮ লাখে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব করে দেখা যায় দ্বিগুণেরও বেশি জনসংখ্যা বেড়েছে গত তিন যুগে। জরিপের তথ্যানুযায়ী দেশে পাঁচ বছরের ব্যবধানে ৪ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমেছে প্রায় ২২ ভাগ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় যে, বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং এ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা ২২ কোটি ২৫ লাখে পৌঁছবে।

বিশ্বের বর্তমান ৭৭০ কোটি জনসংখ্যার সাথে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে আরও ২০০ কোটি যোগ হয়ে ২০৫০ সালের মধ্যে মোট জনসংখ্যা ৯৭০ কোটিতে উন্নীত হবে। জাতিসংঘ প্রকাশিত সর্বশেষ (১৭ জুন ২০১৯)সালের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক দপ্তরের জনসংখ্যা বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন প্রসপেক্ট ২০১৯: হাইলাইটস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক জনমিতির বিস্তৃত নিদর্শন এবং সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, প্রজননের হার হ্রাস ও জনসংখ্যা কমতে থাকা দেশের সংখ্যা বাড়তে থাকার কারণে বিশ্ব জনসংখ্যার গড় বয়স বৃদ্ধি পাচ্ছে।অনুমান অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জনসংখ্যার যে বৃদ্ধি হবে তার অর্ধেকের বেশি হবে নয় দেশে- ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ইথিওপিয়া, তাঞ্জানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রে।বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ২০২৭ সালে চীনকে ভারত ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।এবং আফ্রিকার সাব-সাহারা অঞ্চলের জনসংখ্যা ২০৫০ সাল নাগাদ দ্বিগুণ হবে (৯৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে)।
বৈশ্বিক প্রজনন হার, যা ১৯৯০ সালে ছিল প্রতি নারীতে ৩.২, তা ২০১৯ সালে কমে ২.৫-এ দাঁড়িয়েছে। সেটি ২০৫০ সালে কমে ২.২ হবে।জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া রোধ এবং এক প্রজন্মকে আরেক প্রজন্ম দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে প্রতি নারীতে প্রজনন হার থাকতে হয় ২.১।

আমাদের দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির কতকগুলো কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম অশিক্ষা,বাল্যবিবাহ এবং দারিদ্রতা। এছাড়াও রয়েছে বহুবিবাহ,ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশ,জীবনযাত্রার নিন্মতা,নারী সনাজের পশ্চাৎঅগ্রতা,জন্ম নিয়ন্ত্রণে মূর্খতা বা অজ্ঞতা ইত্যাদি। আর এই সকল অজ্ঞতা ও অসচেতনতার ফলে দিনদিন জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে।এবং সেই সাথে দেশে অন্ন,বস্ত্র,খাদ্য,বাসস্থান,চিকিৎসা, কর্মসংস্থান কমছে এবং বাড়ছে বেকারত্ব। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে অধিক মাত্রায় দূর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকান্ড।সাথে চরম ভাবে বাড়ছে বেকারত্ব ও আয়-উপার্জনহীন ব্যাক্তির সংখ্যা। যারা নিরুপায় হয়ে বেছে নিচ্ছে সমাজের নিকৃষ্টতম পেশা। গ্রাম থেকে শুরু করে বেড়ে চলেছে চুরি, ডাকাতি,ছিনতাই এর মতো খারাপ কাজ গুলোও যা সমাজের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণ হিসাবে সুপরিচিত।আর এসব অনৈতিক কার্মকান্ডের পিছে দায়ী অতিরিক্ত জনসংখ্যা। যে জনসংখ্যা দেশের জন্য জনসম্পদ বা জনশক্তি হিসাবে রুপ লাভ করার কথা ছিলো কিন্তু সার্বিকভাবে বিবেচনা করে সেই জনসংখ্যা পরিনত হচ্ছে হুমকিস্বরূপ হিসাবে। যা একটা সমাজ বা দেশের জন্য অমঙ্গলকর।

দেশের জনসংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে হলে আমাদের প্রত্যেকের সচেতন হতে হবে। সমাজের তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্থান পর্যন্ত অধিক জনসংখ্যা রোধে সচেষ্ট হতে হবে।সমাজের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়িয়ে তুলতে হবে। তাদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানে বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা থাকতে হবে।আয়ের সুষম বণ্টন ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের গুরুত্ব বোঝাতে হবে। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ করতে হবে।সর্বোপরি শিক্ষার আলোয় সমাজকে আলোকিত করতে হবে।

অশিক্ষিত অত্যাধিক জনসংখ্যা আধুনিক বিশ্বে উন্নয়নের অন্তরায় । আর তাই আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও ঘনবসতিপূর্ন দেশে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তরিত করতে হইলে সবার আগে চাই শুষ্ঠ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। চাই শিক্ষিত ও মার্জিত একটা সমাজ ও দেশ।শিক্ষার আলো বা শিক্ষার প্রসার ব্যতীত জনসংখ্যাকে জনসম্পদ বা জনশক্তিতে রুপান্তরিত করা সম্ভব না।জীবনমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষা লাভের মাধ্যমে দেশের জনগণ হয়ে উঠতে পারে দক্ষ জনসম্পদ।যা জনগণকে গড়ে তুলবে উদ্যমি,কর্মঠ,ও উদ্দোক্তা হিসাবে।এদিকে শিক্ষা লাভের মাধ্যমে জনগণ হয়ে উঠবে সচেতন,পরিশ্রমি এবং দক্ষ জনসম্পদ।যার প্রভাবে ধীরে ধীরে কমে আসবে জন্মহার এবং জনগন হয়ে উঠবে জনসম্পদ।