দেনমোহর বিয়ের অপরিহার্য বিষয়।

17

তরিকুল ইসলাম মুক্তারঃ বিয়ে একটি চুক্তি, যা স্বামী -স্ত্রীর মাঝে সম্পন্ন হয়। এই চুক্তিতে কোনো নারী যদি নিজের তরফ থেকে কোনো শর্তারোপ করতে চায় তবে শরিয়ত এর অনুমতি দিয়েছে। যেমন কেউ যদি বলে, আমাকে থাকার ভালো জায়গা দিতে হবে, আমার মাসে খরচের জন্য এতো টাকার দরকার হবে বা সে বলে, আমি ওই সময় বিয়ের চুক্তিতে আবদ্ধ হবো যদি তালাকের অধিকার আমাকে দিয়ে দাও।

শরিয়ত এই অনুমতি দিয়েছে নারী বিয়ের আগেই তার শর্তারোপ করতে পারবে।শরিয়ত বিয়েকে একটি চুক্তি হিসেবে অভিহিত করেছে। অথচ এ নিয়ে আমাদের কোনো ধারণাই নেই। পবিত্র কোরআনুল কারীমে স্বামী-স্ত্রীর বিষয়ে যে ধারণা দিয়েছে আজ পর্যন্ত কোনো সভ্যতা বা সমাজ তা উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে সুরা বাকারায় বলা হয়েছে, ‘তারা তোমাদের পোশাক আর তোমরা তাদের পোশাক।’ পোশাকের সঙ্গে তুলনা করার একটি হেকমত হলো, পোশাক দিয়ে মানুষের সৌন্দর্য অর্জিত হয় আর এটা দিয়ে তাদের আদর্শনীয় জায়গাগুলো ঢাকা থাকে। দ্বিতীয়তো মানুষ যে জিনিসের সবচেয়ে কাছে তা হচ্ছে তার পোশাক তাই স্ত্রীকে স্বামীর জন্য আর স্বামীকে স্ত্রীর জন্য পোশাক বলে একথা বুঝানো হয়েছে-পোশাক যেমন মানুষের খুব কাছে তেমনি স্বামী-স্ত্রী দুজন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকে।

কাছে বুঝানোর ক্ষেত্রে পোশাকের চেয়ে ভালো উপমা আর কী হতে পারে?আল্লাহতায়ালা মা হাওয়া (আলায়হিস সালাম) কে আদম (আলাইহিসালাম) এর পাঁজরের হাড্ডি থেকে সৃষ্টি করেছেন। মাথা থেকে এজন্য সৃষ্টি করেননি, মাথায় কোনো জিনিস স্থির রাখা যায় না। আর পা দিয়ে এজন্য সৃষ্টি করেননি যেনো তাদেরকে পায়ের জুতা বলে গণ্য করা না হয়; বরং মধ্য ভাগ থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে জীবনের ঘনিষ্ঠ সাথী বুঝায় এবং মনের কাছাকাছি থাকে।

বর্তমানে মেয়ে পক্ষ সাদাসিধে ও অনাড়ম্বতাকেই পছন্দ করে নিয়েছে।বিয়েতে মহর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মোহর ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ফরজ এবং বিয়ের অপরিহার্য বিষয়। মোহর ছাড়া বিয়ে হয় না। আকদের সময় উল্লেখ না করলেও কিংবা না দেওয়ার শর্ত করলেও মোহর বাতিল হয় না। স্বামীর কর্তব্য যথাযথভাবে মোহর পরিশোধ করা। বিয়ের পর সহবাস হলে (কিংবা একান্তে সাক্ষাৎ হলে, যাকে পরিভাষায় ‘খালওয়াতে সহিহা’ বলে), পূর্ণ মোহর আদায় করা অপরিহার্য। সুতরাং আকদের সময় মোহর ধার্য করা হলেও ধার্যকৃত পূর্ণ মোহর আর ধার্য না হয়ে থাকলে মোহরে মিসল দিতে হয়।

স্ত্রীর মোহর ফাঁকি দেওয়া অতি হীন কাজ। যে স্বামীর মনে স্ত্রীর মোহর আদায়ের ইচ্ছাটুকুও নেই হাদিসে তাকে বলা হয়েছে ‘ব্যভিচারী’। (মাজমাউজ জাওয়াইদ ৪/৫২২-৫২৩)অনেক বড় অঙ্কের মোহর ধার্য করা যেমন শরিয়তে কাম্য নয়, তেমন তা একেবারে তুচ্ছ ও সামান্য হওয়াও উচিত নয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কিরামের সাধারণ রীতি এ ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ। বিয়ের মোহর নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিন পদ্ধতির একটি অবলম্বন করা যেতে পারে। প্রত্যেকে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী এই তিনটি থেকে কোনো একটিকে নির্ধারণ করে নেওয়া উচিত। (১) মোহরে ফাতেমি তথা হযরত ফাতেমা (রদিয়াল্লাহু আনহা) এর বিয়েতে যে মোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল। অথবা হযরত আয়েশা (রদিয়াল্লাহু আনহা)কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে পরিমাণ মোহর আদায় করেছিলেন। (২) মোহরে মেসাল। তথা মেয়ের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে সাধারণত মেয়েদের যে মোহর নির্ধারণ করে বিয়ে হয়েছে সেই পরিমাণ নির্ধারণ করা।

এ হিসেবে মোহর আদায় সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। (৩) মেয়ের বুদ্ধিমত্তা, গুণ ও শ্রেষ্ঠত্বকে বিবেচনায় রেখে তার যে মোহর সাব্যস্ত করা হয় এটাও সুন্নাত। শরিয়ত এই তিনটি সুযোগ দিয়েছে। যে কোনো একটি আদায় করা যেতে পারে। স্বামীকে এ অধিকার দেওয়া হয়নি, সে মোহরের অধিকার থেকে মাফ চেয়ে স্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। হ্যাঁ স্ত্রী যদি মোহরের পুরো টাকা অথবা আংশিক স্বামীকে ফিরিয়ে দেয় তবে কোরআনের কথা অনুযায়ী এতে বরকত রয়েছে। সুরা নিসায় বলা হয়েছে, ‘তারা যদি সন্তুষ্টিচিত্তে তা থেকে তোমাদেরকে কিছু দেয় তবে তোমরা তা পুত নিখুঁত মনে করে খাও।’ আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে মোহরের গুরুত্ব বুঝে সে অনুযায়ী আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়াতুন নূর আল কাসেমীয়া উত্তরা ঢাকা