পঞ্চগড়ের চা অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে, টি ট্যুরিজমের সম্ভাবনা

8

কামরুল ইসলাম কামু ‘পঞ্চগড় প্রতিনিধি: দেশের সর্ব উত্তরে দার্জিলিং ভ্যারাইটি চা চাষ পঞ্চগড়ের অর্থনীতি উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে কারখানা। পঞ্চগড়ের পাচঁ উপজেলাতেই চা চাষ এখন প্রধান অর্থকরি ফসল বলে পরিচিতি লাভ করছে হেক্টর,বিঘা ও শতকে ও চাষ হচ্ছে এই চা চাষ। বিন্দু বিন্দু থেকে এখন সিন্দুতে পরিনত হয়েছে। কোটি কোটি টাকা হাত বদল হচ্ছে এই অর্থকরি চা’এ।

আপাতত: নানা কারনে এই চা এর কাঁচা পাতার দাম কিছুটা কম হলেও এক সময় ঠিক দাম পাবে চা চাষী এমনটাই মনে করেন স্থানীয় মানুষ।জেলার তেঁতূলিয়া ও পঞ্চগড় সদরের বিভিন্ন জায়গায় চা গাছে সবুজে পরিনত হয়েছে। এর ব্যাপকতা আর সৌর্ন্দয্য দেশের অন্য জেলার মানুষকে দিন দিনমোহিত করছে।

১৯৫৭ সালের ৪ জুন প্রথম বাঙালি হিসেবে তৎকালীন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চা শিল্পে তার অবদান চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের তারিখকে ন্সরণীয় করে রাখতে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে চা শিল্পর ভূমিকা বিবেচনায় সরকার ৪ জুনকে জাতীয় চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এদিকে ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, চা শিল্পের প্রসার’ প্রতিপাদ্য নিয়েদেশে প্রথমবারের মত পালিত হয়েছে জাতীয় চা দিবস।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ চা বোর্ডের আয়োজনে পঞ্চগড়ে উদযাপিত হয়েছে দিবসটি। ১৯৫৭ সালের ৪ জুন প্রথম বাঙালি হিসেবে তৎকালীন চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চা শিল্পে তার অবদান চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের তারিখকে ন্সরণীয় করে রাখতে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে চা শিল্পর ভূমিকা বিবেচনায় সরকার ৪ জুনকে জাতীয় চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে পঞ্চগড় চা বোর্ড জেলা প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় জেলা প্রশাসকের সম্মেললন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আজাদ জাহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচন সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক ড. সাবিনা ইয়াসমিন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইউসুফ আলী, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও চা চাষী আনোয়ার সাদাত স¤্রাট, পঞ্চগড় এম আর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও চা চাষী দেলওয়ার হোসেন প্রধান, ঠাকুরগাঁয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুন নাহার, বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবু বকর ছিদ্দিক, চা চাষী আনিসুজ্জামান নতুন, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম শহীদ বক্তব্য দেন। সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক উধ:তন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শামীম আল মামুন। সভাটি সঞ্চালনা করেন পঞ্চগড় চা বোর্ডের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন।

সভায় পঞ্চগড়,ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট জেলার চা চাষী ও কারখানা মালিকরা উপস্থিত ছিলেন। চা চাষীরা পঞ্চগড়ে তৃতীয় চায়ের নিলাশ মার্কেট, কাঁচা চা পাতার ন্যায্যমূল্যের নিশষ্চয়তা, চা বাগানে সেচ সুবিধা বৃধ্দি ও যান্ত্রিকীকরণ এবং চায়ের ঘুনগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদানের দাবি জানান।

উত্তরাঞ্চল চা শিল্পখ্যাত পঞ্চগড়ের চা বদলে দিয়ে অর্থনীতি ও আর্থসামাজি অবস্থা। গত দুই দশকে চা শিল্পের অর্থনীতিতে নিরব বিপ্লব ঘটেছে দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে। দ্বার উন্মোচন করেছে নতুন এক সম্ভাবনার। এটা সম্ভব হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্দশিতায় দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নের কারণে। সুফল মিলেছে চাঙ্গা অর্থনীতির। উত্তরের সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলের চা শিল্প উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রশ্নই বদলে দিয়েছে আর্থ-সামাজিক অবস্থা।এখন শুধু এ অঞ্চল নয়, এর ব্যাপকতা পেয়েছে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলার জনজীবন । নতুন আশায় নতুন স্বপ্নে এগিয়ে যাচ্ছে প্রান্তিক এলাকার মানুষ।

১৯৯৬ সালে পঞ্চগড়ে সমস্যা ও সম্ভাবনা সরেজমিনে দেখতে রাষ্ট্রীয় এক সফরে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন এ অঞ্চলে শুধু অনাবাদি জমি। হিমালয়কন্যা খ্যাত এ অঞ্চলের পতিত সমতল ভূমিতে দু’তিনটি ফসল ফলতো এখানে। ঘরে ঘরে অসম অভাব অনটন। শিক্ষার আলোর অভাবে কুসংস্কারে জর্জরিত ছিল এলাকার মানুষ। মঙ্গা লেগেই থাকতো সব সময়। গ্রামে গ্রামে মানুষের দরিদ্র, পুষ্টিহীনতা দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। পঞ্চগড়ের তিনদিকে ভারত সীমান্তে চা চাষ হয়, পঞ্চগড়ের মাটিতে চা চাষের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন জেলা প্রশাসক। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে চা বোর্ডের একটি টিম পঞ্চগড় পরির্দশন করে রিপোর্ট দিলেন চায়ের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সিলেট থেকে চায়ের চারা সংগ্রহ করে সার্কিট হাউজে লাগিয়ে দেখলেন চা চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দিনের পর দিন এই এলাকায় গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ চা বাগান। সরকার স্থানীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সমতল ভূমিতে ক্ষ্রদ্র চা চাষ ।

২০০০ সালে এ অঞ্চলে শুরু হয় ক্ষুদ্র আকারে চা চাষ । এক সময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি এখন ভরে গেছে চায়ের সবুজ পাতায়। বাড়ির আঙিনা হয়ে উঠেছে চা আবাদ। গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে স্বস্থির নিশ্বাস। ক্ষুধা-দারিদ্রতা কাটিয়ে বদলে গেছে জীবন। গ্রাম হয়ে উঠছে শহরের আদলে। খড়ের ঘরের পরিবর্তন এখন গ্রামে গ্রামে। সেখানে গড়ে উঠেছে আধুনিকতার শোভায় সুসজ্জিত বাড়ি। উচ্চ শিক্ষিত হয়ে উঠছে ছেলেমেয়েরা। নতুন নতুন স্বপ্নে বিভোর এখানকার চা চাষীরা। বাড়ছে নতুন নতুন চাষী। তেঁতুলিয়ায় প্রথম চা চাষ শুরু হয় ‘পেদিয়াগছ’ গ্রামে। গ্রামটি এখন ‘চা গ্রাম পেদিয়াগছ’ বলে পরিচিতি পেয়েছে। এ গ্রামের চা চাষের ইতিহাস জানাতে চা চাষি অ্যাড. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাবা ইশাহাক মন্ডলসহ স্থানীয় আরও কয়েকজন প্রথম পেদিয়াগছ গ্রামেই ক্ষুদ্র চা চাষ শুরু করে। চা চাষের কারণে আর্থÑসামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে জীবন-মানের অনেক উন্নতি হয়েছে। এ গ্রামের প্রায় পরিবারই এখন চা বাগানের মালিক। আর চা বাগান ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটছে চায়ের গ্রাম দেখতে। এতে করে টি ট্যুরিজমের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি করেছে।ক্ষুদ্র চা চাষিরা বলছেন, সমতলে চা আবাদ করে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। চা শিল্প ঘিরে এ এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ২০টি চা কারখানা। স্থানীয়ভাবে চা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে মালিক হয়ে গেছেন অনেকেই । এ কারখানা প্রতিষ্ঠার কারণে স্থানীয় বেকারদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সূযোগ হয়েছে।

স্থানীয় চা কারখানা মালিক শেখ ফরিদ জানান, আগে অন্য ব্যবসা করতাম। এ এলাকায় আমার একমাত্র নারী চা চাষী। সে সময় বাগানের কাচা চা পাতা কারখানায় নিয়ে বিভিন্ন ঝামেলার মুখোমুখি হতাম। এ জন্য এ এলাকার ক্ষুদ্র চা চাষীদের জীবনমান উন্নয়নের কথা চিন্তা করে বর্তমানে নিজেই চা কারখানা স্থাপন করেছি। তাতে করে এলাকার অনেক বেকারদের এই চা কারখানায় কর্মসংস্থান হয়েছে। সেই সাথে স্থানীয় চাষিদের ঝামেলাও অনেককাংশে কমেছে।

এদিকে চা শিল্প ঘিরে সম্ভাবনা তৈরি করেছে টি ট্যুরিজমের। চা বাগানের মাঝখানে দেখা মিলছে বাড়িঘর। এতে করে সৃষ্টি হয়েছে মুগ্ধকর সৌন্দর্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসছেন চা বাগানের সবুজের সমারোহ নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তবে অভিযোগ উঠেছে, ক্ষুদ্র চা চাষীরা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বাগানের উৎপাদিত কাচা চা পাতার কাংখিত মূল্য পাচ্ছেন না কারখানা মালিকদের সিন্ডিকেটের কারণে। তাদের অভিযোগ, কারখানা মালিকরা নির্দিষ্ট কিছু দালাল তৈরি করে কাঁচা চা পাতার দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে অনেক সময় সকাল বিকাল কা^চা চা পাতার দাম উঠা নামা করে। সরকারি নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় অবৈধ ভাবে চাষিদের ঠকাচ্ছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি আশা করেন চা চাষীরা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন চায়ের ‘অকশন মার্কেট’ বিবেচনার ভিত্তিতে চা চাষিদের কাচা চা পাতার মূল্য পরিশোধ করা হয়।

বাংলাদেশ টি বোর্ডের নর্দান বাংলাদেশ চা প্রকল্পের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডায়নামিক ও দুর্দর্শিতা ও কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের কারণেই বদলে গেছে এখানকার মানুষের জীবন যাত্রা। কাচা চা পাতার দাম বর্তমানে ঠিকই আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মহামারী করোনা পরিস্থিতিতেও এ বছর চা উৎপাদনে সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। আঞ্চলিক চা-বোর্ড কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে পঞ্চগড়সহ উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায় সমতলের ১০টি চা-বাগান ও ৭ সহস্রাধিক ক্ষুদ্রায়তন চা-চাষির চা-বাগান থেকে ১ কোটি ৩ লাখ বা ১০ দশমিক ৩০ মিলিয়ন কেজি চা-উৎপাদিত হয়েছে। এ বছর চায়ের জাতীয় উৎপাদন হয়েছে ৮৬.৩৯ মিলিয়ন কেজির মধ্যে উত্তরাঞ্চলের সমতলের চা-বাগান থেকে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ জাতীয় উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে। এখন দাবি উঠেছে চা পাতার নিলাম ডাক এখন পঞ্চগড়ে করা হোক। এ দাইব সর্ব বিদিত হয়ে উঠেছে।