বজ্রপাতে আতংকিত নয় সতর্ক হতে হবে

6

ইমরান হুসাইন : বর্তমান সময়ে করোনা ভাইরাসের পাশাপাশি দেশ ও জনগনের কাছে এক আতংকের নাম বজ্রপাত। চলমান সময়ে বজ্রপাতে সারাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে ক্রমাগত ভাবে।যার শিকার হচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত । বজ্রপাতের ফলে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও কেউ আপনজন হারাচ্ছে ফলে দ্রুত গতিতে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে বজ্রপাতের আতঙ্ক। বাংলামাসের বৈশাখ পার হয়ে সবেমাত্র জ্যৈষ্ঠ মাসে পা রেখেছে এরই মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ মেঘ ঝড়-বৃষ্টির পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে যেকারণে বজ্রপাত এখন একটি আতংকের নাম। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যতই দিন যাচ্ছে দেশে বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা। প্রতি বছর গড়ে বজ্রপাতে বাংলাদেশে ২৫০ থেকে ৩৫০ জনের মৃত্যু হয়। গত কয়েক দশকের পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা গেছে, বিশ্বে বজ্রপাতের কারণে যত মানুষের মৃত্যু হয় তার চার ভাগের একভাগ মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এই এক দশকে দেশে বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটেছে দুই হাজার ৮১ জনের। বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় ২০১৬ সালে সরকার বজ্রপাতকে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বজ্রপাত রোধে নেয়া হয় বিশেষ পরিকল্পনা ও সতর্কীকরণ কর্মসূচি। কিন্তু মৃত্যুর মিছিল তাতে থামানো যায়নি। প্রাক-বর্ষা মওসুম শুরুর এ সময় থেকে কৃষক ও জেলেদের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ দেখা যায়। বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণের কথা বললেই প্রথমেই আসবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা। তাছাড়া পরিবেশ দূষণ, বৃক্ষসম্পদ ধ্বংস, নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ তো রয়েছেই। বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে চলতি বোরো মৌসুমে পাহাড়ি ঢল এবং বৈরী আবহাওয়ায় গোলায় ধান তুলতে এবং জায়গা বিশেষ নতুন জমি প্রস্তুত করতে বজ্রপাতের হুমকি নিয়েই মাঠে কৃষকেরা। যেকারণে বজ্রপাতে কৃষকরাই বেশি শিকার হচ্ছে। বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে৷ ওই বছর বজ্রপাতে নিহত হয়েছিলেন ১৮৬ জন৷ অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি৷গত বছর এপ্রিল মাসেই এ প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে নিহত হয়েছেন ৫০ জন। এবারও সংখ্যাটা কম নয়। বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়৷ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডাব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্কফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণায়‘বলা হয়েছে প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়৷ বছরে দেড়শ’র মতো লোকের মৃত্যুর খবর সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে এটার সংখ্যা আরো বেশিই হবে কারণ সব তথ্য আর গণমাধ্যমে উঠে আসে না। দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ২০৫, ২০১৬ সালে ২৪৫, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৪ সালে ২১০, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১২ সালে ৩০১ এবং ২০১১ সালে ১৭৯ জন মানুষের মৃত্যু হয় বজ্রপাতে। গবেষণায় এসেছে আমাদের দেশে বজ্রপাতের মূল কারণ দেশটির ভৌগলিক অবস্থান। বাংলাদেশের একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে গরম আর আর্দ্র বাতাস আসছে। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ী এলাকা, কিছু দূরেই হিমালয় পর্বত রয়েছে, যেখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। এই দুইটা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। শীতের পর বঙ্গোপসাগর থেকে উষ্ণ বাতাস আসতে শুরু করে, অন্যদিকে হিমালয় থেকে আসে ঠাণ্ডা বাতাস। দক্ষিণের গরম আর উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে অস্থিতিশীল বাতাস তৈরি হয় আর এর থেকে তৈরি হয় বজ্র মেঘের। এরকম একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে বজ্রের তৈরি হয়। এরকম উচ্চ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যখন মাটিতে নেমে আসে, তখন সবচেয়ে কাছে যা পায়, তাতেই আঘাত করে।

দেশের আয়তন হিসাবে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। এর কারণ সচেতনতার অভাব । অন্যদিকে ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা বা নেপালে বজ্রপাত হলেও সেখানে মৃত্যুর হার এত বেশি নয়। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাত-প্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম। গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, যেসব এলাকায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে সেসব এলাকায় যে মেঘের সৃষ্টি হয়, সেখান থেকেই বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকে।

অন্যদিকে প্রাকৃতিক সংকটও আমাদের মধ্যে এখন অনেক বেশি আগে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর উঁচু গাছ ছিল৷ তাল গাছ, বটগাছ প্রভৃতি৷ স্বাভাবিক নিয়মে বজ্রপাত হলে এসব উঁচু গাছ তা গ্রহন করে নিতো৷ কিন্তু এখন তা না থাকায় যখন খোলা মাঠে বজ্রপাত হয় তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ শহরে গাছ না থাকলেও উঁচু উঁচু ভবন আছে৷ ফলে শহরের মানুষ এই মত্যু থেকে রেহাই পাচ্ছে।আর বজ্রপাতে গ্রাম অঞ্চলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে আনুপাতিক হারে অনেক বেশি। গত কয়েক বছর ধরে বজ্রপাতের হার এবং বজ্রপাতের সময়সীমা বেড়েছে। এতে বেড়েছে বজ্রাঘাতে মৃতের সংখ্যাও। প্রতিবছর মার্চ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত বজ্রপাতের ঘটনা বেশি ঘটে।

গত বছরের ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বজ্রাঘাতে মোট ৭৩ জন মারা গেছেন এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৪ শিশু, পাঁচ নারী ও ৫৪ জন পুরুষ। এর মধ্যে ২১ এপ্রিল থেকে ১৮ মে’র মধ্যে নিহত হয়েছেন ১৮ জন। ২০১৮ সালে বজ্রাঘাতে নিহতের ঘটনা ঘটে ২৭৭টি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ায় ২০১৫ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণার পর জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ২০১৭ সাল থেকে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার তার একটি হচ্ছে তালগাছ রোপণ। ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকার বজ্রপাত রোধে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ২৮ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে এবং তা বাস্তবায়নও হচ্ছে। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে তালগাছ লাগানো একটা ভালো সমাধান। তবে এটা বেশ সময়সাপেক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি। তাই দ্রুত লম্বা হয় এমন বড় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বত্র তালগাছের সংখ্যা বাড়লে বজ্রপাত সেখানেই হবে, এবং এড়ানো যাবে প্রাণহানি। যেহেতু বজ্রপাতকে আমরা চাইলে বন্ধ করতে পারি না কিন্তু বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অবলম্বনের মাধ্যমে কিছু নিয়ম কানুন মেনে চললে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে পারি। এক্ষেত্রে একতাবদ্ধ হয়ে আমাদের কিছু নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সেজন্য আমাদের প্রথমেই বজ্রপাতের লক্ষ্মণ গুলো সম্পর্কে জানতে হবে। সেই সাথে বেশি বেশি গাছপালা লাগাতে হবে,তালগাছের সংখ্যা অত্যাধিক পরিমাণে হলে ভালো হয়। যখনই আকাশ মেঘলা দেখা যাবে তখনই ঘরে বা নিরাপদে অবস্থান করতে হবে। আমরা অনেক সময় ঝড়ের কবলে পড়লে বড় গাছ টিনের খুটির নিচে আশ্রয় নিই এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। ধাতব বস্তু থেকে দুরে থাকতে হবে।

আবার অধিক পানি থেকে দূরে থাকতে হবে যেনো আশেপাশে বিশাল পানি না থাকে। সর্বশেষ এটাই যে তাৎক্ষণিক ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে। এবং সবাইকে সচেতন হতে হবে। বজ্রপাতে প্রানহানী কমাতে জনসচেতনতা সব থেকে জরুরী। আর তাই বজ্রপাত থেকে রক্ষার উপায় সমূহ গুলো সম্পর্কে জনগনদেরকে অবগত থাকতে হবে।প্রকৃতির উপর অত্যাচার বন্ধ করতে হবে।বেশি বেশি গাছপালা লাগাতে হবে।তাহলে ধীরে ধীরে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমে আসবে।