মানুষ কবে মানুষ হবে?

18

এ.জে.সুজন : আমাদের একি দশা! দিন দিন কোথায় যাচ্ছি আমরা? কোথায় আমাদের বিবেক, মানবিকতা, মূল্যবোধ আর মনুষ্যত্ব? বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যা করার মতো নৃশংস ঘটনা। শহুরে ব্যস্ততায় কিংবা গ্রামের নির্জনতায়, কর্মস্থলে, গণপরিবহনে-সর্বত্রই ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষকের লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাদ যাচ্ছে না কন্যাশিশু ও বৃদ্ধ নারীরাও। রেহাই পাচ্ছে না প্রতিবন্ধীরাও। জঙ্গলে ফেলে রেখে যাওয়া হচ্ছে বৃদ্ধা মাকে। লোপাট হয় করোনাকালের ত্রাণ!

চিন্তা-চেতনা, বিবেক-বিবেচনা, কাণ্ড-জ্ঞান আর বিচার-বুদ্ধির ক্ষমতার কারণেই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তবে মনুষ্যত্ববিহীন এই মানুষই সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব হিসেবে নিজেকে আবির্ভূত করতে পিছ পা হয় না। মানবীয় গুণাবলি তথা মানবিক আচরণ ও নৈতিক শিক্ষা না থাকলে মানুষ হওয়া যায় না।

প্রেম-ভালোবাসা, দয়া-মায়া, উদারতা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা, ধৈর্য, ত্যাগ, ক্ষমা, সহনশীলতা, সহানুভূতিশীলতা, সৌজন্যবোধ, শৃঙ্খলা, বিনয়, ভালো চিন্তা ও ভালো ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ মনুষ্যত্বের অধিকারী হয়। দান করা, দয়া দেখানো, ক্ষমাশীল হওয়া, সত্য প্রতিষ্ঠা করা, অহিংসা লালন করা, পরোউপকার করা পূণ্যর কাজ হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।চারিদিকে আজ শুনি মজলুমের আত্মধ্বনি, আহাজারি আর সেই আত্মনাদ শুনে হায়নাদের উল্লাস, অট্ট হাসি, সে হাসিতে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আকাশে বাতাসে, হৃদয়ের কান্না যেন ছড়িয়ে পড়ছে দিক থেকে দিগন্তে, আজ আর কেউ শুনতে পায় না সেই আহাজারি। সবাই যেন নিরব দর্শকের মত দাঁড়িয়ে দেখছে আজ, এই কান্নার আওয়াজ ধ্বনিত হচ্ছে মানবতার আকাশে, আহ! আফসোস! আর দেখি লুণ্ঠিত হচ্ছে মানবতা, আজ যেন মানুষের কোন মূল্য নেই এই ধরায়, অথচ মানুষই শ্রেষ্ঠ, স্রষ্ঠার এক মহাদান। আমি দেখেছি মানবতা, দেখেছি মনুষ্যত্ব, শুনেছি জীবনের জয়গান, কোথায় হারিয়ে গেলো আজ স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সেই মহাদান!

সৃষ্টির মাঝে করুণাময় আল্লাহ মানুষকে দামী করে বানিয়েছে। তাদের মর্যাদা দিয়েছেন সব সৃষ্টি কুলের উপরে। আর সমস্ত সৃষ্টিকুলকে যেন মানুসের আজ্ঞাবহ করে দিয়েছে। এ এক মহা করুণা মহান প্রভুর আল্লাহর পক্ষ থেকে। কিন্তু দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে এই মহা নেয়ামত আমরা সকলে ভোগ করছি। এই মহা বিশ্বের মাঝে আমরা সকলে জ্ঞাতির সম্পর্কে বেঁচে আছি। আর এ বেঁচে থাকা সার্থক হবে তখনই যখন মনুষ্যত্ব মানবতা বজায় রেখে পৃথিবীতে সুখ আর শান্তির বাগিচা রচনা করা যাবে, ঠিক তখনই গড়ে উঠবে আত্মীয় বেশে বেঁচে থাকা। কিন্তু আজ দেখি চারিদিকে হানাহানি, অন্যায়, অত্যাচার এমন ভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যা সীমাহীন মাত্রা ছেড়ে গেছে, আজ যেন মানুষের কোন মূল্যই নেই, জ্ঞানী-গুনীজনরা যেন আজ অবেহেলিত, তাদের জ্ঞানগর্ভের কথা গুলো যেন বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ, আজ মনুষ্যত্বের কথা বললে যেন অবাক দৃষ্টিতে তাকায়, সত্য যেন আজ চিড়িয়াখানার পশুতে পরিণত হয়েছে।

মানুষের ভেতর ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব থাকা স্বাভাবিক। তবে এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, উগ্রতা, স্বার্থপরতা এবং ক্রোধ প্রভৃতি পরিহার করে ভালোকে বেছে নেওয়াই মনুষ্যত্বের কাজ। মানুষ অন্তস্থলে এই সব খারাপ গুনাবলী ধারণ করলে মনুষ্যত্ব হারিয়ে যায়। তখন মানুষ আর মানুষ থাকে না। মানুষ হয়ে যায় জীব-জন্তুর মতো। সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি, আধিপত্য বিস্তার, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, অপহরণ, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতি, ইভটিজিং, প্রতারণা, চাঁদাবাজি এবং ঘুষ ইত্যাদি মনুষ্যত্ব লোপ পাওয়ার অন্যতম কারণ।নিজের বিরুদ্ধেই প্রতিনিয়ত যুদ্ধে নামছে মানুষ। সেই যুদ্ধে মরছে তাদের মূল্যবোধ। হারিয়ে যাচ্ছে মানবিকতাও। অন্ন-বস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব বড়। মানুষ যতদিন পর্যন্ত এই বোধটি ধারণ করবেন না, তত দিন পর্যন্ত কেউ মানবজীবনে সোনা ফলাতে পারবে না। তাদের মধ্যে সেই শিক্ষা প্রাথমিক পর্যায় থেকেই দিয়ে দিতে না পারলে কখনোই মূল্যবোধ সৃষ্টি হবে না। কেননা শিক্ষার আসল কাজই হলো মূল্যবোধ সৃষ্টি। শুধু জ্ঞান দান নয়। জ্ঞান মূল্যবোধ সৃষ্টির উপায়মাত্র।

মানবতা বা মনুষ্যত্ববোধ না থাকলে মানুষ আর পশুর মধ্যে তফাৎ থাকে না। মানুষের ভেতর মনুষ্যত্ব থাকতে হবে। কেননা মনুষ্যত্ব মানুষের জীবনকে দীপ্তিময় শিখার মত উজ্জ্বল করে। এর মাধ্যমে সে নিজেকে আলোকিত করার পাশাপাশি অন্যদেরও আলো দিতে পারে। তাই সকল মানুষের উচিত মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা। অন্তরের প্রশান্তি ও কল্যাণ কামনা নিয়ে মানুষের ভেতর মনুষ্যত্ব জেগে উঠবে। একজন ধর্মসাধক তার পবিত্র জবানীতে বলেছিলেন মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন। আর ঐ মহাসাধকের উপদেশ অনুযায়ী আমরা যদি প্রকৃত মানুষ হতে পারি তাহলে দূর হবে সব বিবাদ। মানুষ আবার মানুষ হবে। এটাই অধমের প্রত্যাশা।