সচেতনতাই পারে শিশুকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে

15

মোঃ হাবিবুর রহমান: সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় চড়আঙ্গারু গ্রামে বসবাস করে আলেয়া খাতুন। স্বামী কৃষি কাজ করে। স্বামীর কাজে সহযোগিতা করে আলেয়া। আলেয়ার দুই ছেলে তিন মেয়ে। ছোট মেয়ে আম্বিয়া। বয়স ৯ বছর। সকাল হতে না হতেই ঘুম থেকে উঠে চলে যায় বাড়ির বাইরে। সারাদিন ব্যস্ত থাকে সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলা নিয়ে।

বাড়ীর পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ফুলছড়ি নদী। আষাঢ মাস। নদীতে পানি থৈ থৈ করছে। অল্প অল্প স্রোত আছে নদীতে। বাড়ীর ঘাটে নৌকা বাঁধা আছে। নৌকায় বসে সবাই মিলে খেলা করছে। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচির আওয়াজ। সবাই নদীর ঘাটে এসে দেখে আম্বিয়া নৌকা থেকে পানিতে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। অন্যান্য বান্ধবীরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কেউ তাকে নদী থেকে তুলতে পারছে না। অবশেষে আম্বিয়ার চাচা আম্বিয়াকে নদী থেকে তুলে আনল। বেঁচে গেল আম্বিয়ার জীবন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে মারা যায় প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিশু। এদের বয়স ২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ পানিতে ডুবে মারা যাওয়া। দেশে শিশুমৃত্যু রোধে এবং বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং তাতে সফলও হয়েছে। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে সে অর্থে কোন অগ্রগতি এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২০’ থেকে দেখা যায়, দেশে ৫ বছরের কম বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া। এরপরই পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর স্থান, যা প্রায় ৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে সফলতার দিক থেকে ডায়রিয়ায় মৃত্যু রোধে বাংলাদেশ এক নম্বর। গণটিকা দেয়ার কারণে ডিফথেরিয়া বলতে গেলে একেবারেই নেই দেশে। ধনুষ্টংকার রোগটিও এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য এদেশে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি।

শিশু ও মাতৃ মৃত্যু রোধ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি খাতে সরকারি এবং বেসরকারী উদ্যোগে দেশে অনেক কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে উল্লেখযোগ্য কোন কর্মসুচি গ্রহণ করা হয়নি, যদিও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় শিশুদের সাঁতার শেখানোর উপর দু’টি কর্মসুচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতায় আটটি সংস্থার মাধ্যমে ‘শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম’ প্রকল্পের আওতায় শিশু ও মাতৃ মৃত্যু রোধ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয়ের পাশাপাশি শিশু ও কিশোরদের সাঁতার শেখানোর গুরুত্বের উপর দেশব্যাপী বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। গণমাধ্যম গুলিতে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করা হলে এ ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, শিশুদের প্রাণ রক্ষা পাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র মতে, শিশুদের পানিতে ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, এর তিনটিই বাংলাদেশের সাফলের অভিজ্ঞতা থেকে নেয়া। এগুলো হলো-পুকুরের পাড়ে বেড়া দেয়া, শিশুর দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং শিশুকে সাঁতার শেখানো।

শিশুদের সাঁতার শেখার গুরুত্বের ওপর স্কুলের শিক্ষকেরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রতিটি মানুষের শারিরীক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য প্রতিদিন ব্যায়ম করা প্রয়োজন। সাঁতার একটি খুবই ভালো ব্যায়াম। আর এ কারনে প্রতিটি মানুষের সাঁতার কাটার অভ্যাস করা অত্যান্ত জরুরি। সাঁতারের মাধ্যমে অনেক রোগ ব্যাধি থেকে মানুষ মুক্ত থাকতে পারে বলে বিশিষজ্ঞগণ মনে করেন। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শিক্ষকেরা ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে তুলে ধরতে পারেন। কাজেই, সাঁতার শেখার ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং আগ্রহ সৃষ্টিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেতে পরে। পাঠ্যপুস্তকেও সাঁতার শেখার গুরুত্ব বিষয়ে অধ্যায় সংযুক্ত করা যেতে পারে।সরকারের পাশাপাশি আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সচেতনতাই পারে কেবল পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধ করতে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই।

একজন মানুষ সাঁতার জানলে কি কি সুবিধা ভোগ করতে পারে এবং সাঁতার না জানলে কি কি অসুবিধাগুলো সম্মুখিন হতে পারে তা বিভিন্ন মিডিয়ার/গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রচারের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এর ফলে মানুষ সাঁতার কাটতে উদ্বুদ্ধ হতে পারবে।

পানিতে ডুবে মৃত্যু নিয়ে জাতীয়ভাবে সর্বশেষ জরিপ হয়েছে ২০১৬ সালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং ইউনিসেফের সহযোগিতায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ পরিচালিত ওই জরিপের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী প্রতিবছর সব বয়সী ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এদের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থাৎ আনুমানিক ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন অনূধ্ব ১৮ বছরের শিশুরা পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন, অর্থাৎ বছরে প্রায় ১০ হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর ৪৩ শতাংশের কারণ পানিতে ডুবে মারা যাওয়া।

প্রকট সমস্যা হল শহরের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অথবা যারা স্কুলে যায়নি তাদের নিয়ে। এখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠনে অবকাঠামো নির্মাণ করে লোকবল নিয়োগ দিতে পারে। শহরের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সাঁতার শিখানোর অবকাঠামো নির্মাণের জায়গা রয়েছে। এছাড়া সাধারণ জনগণের জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে সাঁতার শিখানোর ব্যবস্থা করতে হবে, প্রয়োজন শুধু উদ্যোগ গ্রহণ। এ উদ্যোগে বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশনকেও যুক্ত করা যায়। প্রতিটি বহুতল ভবনে সুইমিং পুল করার বাধ্যবাধকতা করা যেতে পারে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। এর পাশাপাশি প্রতিটি শহরে বিদ্যমান পুকুর/লেকগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে সাঁতার শিখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুমৃত্যু কমাতে প্রসুতিদের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। এ সময় স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়ে পরামর্শের সংগে শিশুর পানিতে ডুবে যাওয়ার বিষয়টিও যুক্ত করতে হবে। এছাড়া সমাজের প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে। বিশেষকরে যে সকল এলাকায় ডোবা, নালা, পুকুর অথবা নদী আছে। সে সকল এলাকার মা, বাবাসহ পরিবারের সকল শ্রেণীর মানুষদের সচেতন হতে হবে। যাতে কোন শিশু পানির দিকে যেতে না পারে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও ব্যাপক সচেতনতামুলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তবেই আমাদের শিশুরা পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পাবে।

লেখক: মোঃ হাবিবুর রহমান, পিআইডি- শিশু ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক যোগাযোগ কার্যক্রম (৫ম পর্যায়) প্রকল্প কার্যক্রম।