সিলেটে ভূমিকম্পে স্কুল ভবনে ফাটল, নির্মানে ত্রুটি ছিলনা : প্রকৌশলী নজরুল হাকিম

সিলেটে ভূমিকম্পে স্কুল ভবনে ফাটল, নির্মানে ত্রুটির অভিযোগ

12

সাদিক চৌধুরী সিলেট ব্যুরো : শতাব্দির পুরাতন সিলেট রাজা জিসি হাইস্কুলের নতুন ভবনে বেশ কয়েকটি বিপজ্জনক ফাটল দেখা দিয়েছে। গত সোমবার ৩ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে এফাটল দেখা দেয় । এ নিয়ে আতঙ্কিত নগরের মানুষজন। ইস্কুল ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ায় এর নির্মাণের মান নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান ভবনটি পরিদর্শন শেষে নির্মাণের ত্রুটি থাকতে পারে বলে জানান। আর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ভবনটিকে পুরনো হিসেবে উল্লেখ করে নির্মানে কোন ত্রুটি ছিলনা বলে জানান।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আাজজুর রহমান বলেন, আমি ভবনটি পরিদর্শন করেছি। যা দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে এখানে নির্মাণ ত্রুটি থাকতে পারে। ইটের সুরকি দিয়ে পিলার দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও পরীক্ষা করলে আরও অনেক ত্রুটি বের হতে পারে। তবে এটি মূলত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে করা। আমি তাদের জানিয়েছি।

অপরদিকে নগরীর বন্দরবাজার এলাকায় স্থাপিত শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী স্কুলটির ফাটল ধরা ভবন পরিদর্শন করেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিম। পরিদর্শন শেষে তিনি এ ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। একই সাথে শ্রেণিকক্ষের সংকট নিরসনে ৬ তলা ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন। এসময় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের এ নির্বাহী প্রকৌশলী দাবি করেন, এটি প্রায় ২৭ থেকে ২৮ বছর আগের ভবন। দ্বিতল ভবনের নিচ তলা ১৯৯৩-৯৪ অর্থ বছরে নির্মিত হয়েছে। আর উপরতলা ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে নির্মিত হয়েছে। তাই এটির স্ট্রাকচার ভূমিকম্প সহনীয় করে তৈরি হয়নি। ভবনটি নির্মানের দায়িত্বে থাকা অনেক প্রকৌশলী আজ আর জীবিত নেই, ভবনটি নির্মাণে কোন ত্রুটি ছিলনা।

রাজা জিসি হাই স্কুল এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায় এখানে মোট ৩টি ভবন। ভেতরে প্রবেশ করে ডান পাশে সিটি সুপার মার্কেট লাগোয়া ফাটল ধরা এ ভবনটির নামকরণ হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও সিলেটে সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের নামে।

অপরদিকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহা. আব্দুল মুমিত বলেন, ১৮৮৬ সালে স্থাপিত এ স্কুলের দ্বিতল ভবনের কাজের শেষে বুঝে পেয়েছি ২০১৯ সালে। আর আমার জানামতে নিচতলার কাজ হয়েছে ২০০৬-০৭ অর্থ বছরে।এমনকি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে ফাটল ধরা এ ভবনের নিচতলার কাজ ২০০৬-০৭ অর্থ বছরেই হয়েছে বলে জানায়।

ওই সূত্র থেকে আরও জানা যায় ভবনটির নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। পিলারে পাথরের বদলে দেওয়া হয়েছে ইটের সুরকি। আর প্রতি ৪ বালতি পাথরের সাথে কম পক্ষে এক বালতি সিমেন্ট ও ৩ বালতি বালু দেওয়ার কথা থাকলেও তা খুবই কম দেওয়া হয়েছে। দেখা যায় ভবনের নিচ তলায় বড় ধরণের ফাটল ধরা দিয়েছে। এমনকি গ্রন্থাগারের ভিতরের অংশেও বড় ফাটল। আর খসে পড়েছে পস্তার। এসব ফাটল দিয়ে দেখা যাচ্ছে পিলারে পাথরের বদলে দেওয়া হয়েছে ইটের সুরকি।

তবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল হাকিমের দাবি, নির্মাণ ত্রুটি ন্য় ভবনটি পুরনো হওয়ায় প্রাকৃতিক কারণেই এটিতে ফাটল ধরা দিয়েছে,৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় ভবনটি নির্মাণ হয়েছে । অপরদিকে রাজা জিসি হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ২০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘আমি যেটুকু জেনেছি ২০০৪ সালে টেন্ডার করা হয়েছে এবং ২০০৬ সালে নিচতলার কাজ হয়েছে। তাছাড়া আমি সরেজমিনে দেখেছি পিলারে পাথরের বদলে ইটের সুরকি দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে নির্মাণজনিত ত্রুটি থাকতে পারে বলে আমারও মনে হচ্ছে। তাছাড়া ভবনের পাশে একটি পুকুর ছিলো। এটি ভরাট করা হয়েছে। এটিও একটি কারণ হতে পারে।

অপরদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি জেনেছি। আগামী শুক্রবার হয়ত আমরা একটি যন্ত্র দিয়ে এটি পরীক্ষা করে তারপর বলতে পারব নির্মাণজনিত কোন ত্রুটি আছে কি না। আপাতত পরীক্ষা না করে মন্তব্য করতে পারছি না।এর আগে সোমবার (৭ জুন) সন্ধ্যায় ৬ টা ২৯ মিনিটে একবার এবং ৬ টা ৩০ মিনিটে একবার ভূমিকম্প হয়। কিন্তু আবহাওয়া অফিসে একবারের ভূমিকম্পের হিসেব সংরক্ষিত হয়ে রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ৩ দশমিক ৮ দেখা গেছে বলে জানান আবহাওয়া অফিস ঢাকার জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মমিনুল ইসলাম। আর এর উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ১৮৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে হওয়া ভূমিকম্পটি সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুর বলেও জানান সিলেটের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ সাঈদ আহমদ চৌধুরী।

অপরদিকে ভূমিকম্পে রাজা জিসি স্কুলে ফাটল ধরার খবর পেয়ে তাৎক্ষনিক পরিদর্শন করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এদিকে সম্প্রতি বারবার ভূমিকম্পে সিলেটজুড়ে আতংক বিরাজ করছে। গত মাসের ২৯ তারিখ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফা ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে সিলেট। পরে ৩০ মে ভোর রাতে ফের ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এসব ভূমিকম্পের পর নরেচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সে সময় সিলেটে বড় ভূমিকম্পের ‘বিফোর শক’ হিসেবে ছোট ভূমিকম্পগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী ১০দিন সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরামর্শের পর সিলেট নগরে ২১টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে তা ১০ দিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় সিসিক। কিন্তু এ নির্দেশনার ৯দিনের মাথায় ফের দুইদফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় আতংক বিরাজ করছে।

এমন অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এমন প্রশ্নে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এই ভবন থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এখানে আবেগের কোন স্থান নেই। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিবো। ঝুঁকিপূর্ণ সকল ভবন ভাঙবেন না কি করবেন তা উনারা সিদ্ধান্ত নিবেন। তা না হলে এরকম অবস্থায় কেউ এসব ভবন-মার্কেটে অবস্থান করতে পারবেন না।