দৈনিক জনবাণী | বাংলা নিউজ পেপার | Daily Janobani | Bangla News Paper
বৃহঃস্পতিবার, ৬ অক্টোবর ২০২২

সুন্দরবনে কীভাবে যাবেন?



প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৯:১৫ পূর্বাহ্ন

সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক বিস্ময়ের নাম। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন বা লবণাক্ত বনাঞ্চল। সুন্দরবনের মোট আয়তন প্রায় ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার।

সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের আয়তন ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটার। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলার অংশ নিয়েই বাংলাদেশের সুন্দরবন। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

সুন্দরবনের ১,৮৭৪ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে নদীনালা ও বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ অঞ্চল। রয়েল বেঙ্গল টাইগার সহ বিচিত্র নানান ধরণের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে সুন্দরবন পরিচিত।

এখানে রয়েছে প্রায় ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রাজাতির পাখি, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ সরীসৃপ এবং ৮ টি উভচর প্রাণী। সুন্দরী বৃক্ষের নামানুসারে এই বনের নাম সুন্দরবন রাখা হয়।

সুন্দরবন বেড়ানোর উপযুক্ত সময়:

নভেম্বর থেকে মার্চ মাস সুন্দরবন ঘুরে দেখার জন্যে উপযুক্ত সময়। এই সময় নদী ও সমুদ্র শান্ত থাকে, তাই সুন্দরবনের সকল দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যায়। খুলনা ও মোংলা থেকে সবচেয়ে কাছে করমজল ও হারবাড়িয়া বছরের যে কোন সময় একদিনেই ঘুরে দেখা যায়। তবে মূল সুন্দরবনের স্বাদ পেতে হলে গহীনের স্থান গুলোতেই যেতে হবে।

সুন্দরবনের দর্শনীয় ভ্রমণ স্থান:

সুন্দরবন বিশাল একটি অঞ্চল। বন বিভাগ থেকে সুন্দরবনের নির্দিষ্ট কয়েটি জায়গা ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়। সুন্দরবন ঘুরে দেখা যায় খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও বরগুনা দিয়ে। তবে সবচেয়ে বেশি পর্যটক ভ্রমণ করে থাকে খুলনা ও বাগেরহাটের মোংলা দিয়ে। খুলনা ও মোংলা থেকে ভ্রমণের জন্যে উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান গুলোর মধ্যে রয়েছে করমজল, হারবাড়িয়া, কছিখালি, কটকা, জামতলা, হিরন পয়েন্ট ও দুবলার চর।

করমজল: মোংলা থেকে সবচেয়ে কাছে করমজল। এটি মুলত বন বিভাগের হরিণ ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। এখানে আছে বনের ভিতর দিয়ে যাওয়া কাঠের পুলের ট্রেইল, হরিণ, কুমির, বানর সহ নানা প্রজাতির গাছ গাছালি। সুন্দরবনের গহীনে যদি পশুপাখি দেখার সুযোগ না হয়ে থাকে, তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটবে করমজলে।

হারবাড়িয়া: হারবাড়িয়া সুন্দরবনের অন্যতম একটি পর্যটন স্থান। মোংলা থেকে দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। এখানের মূল আকর্ষণ বনের ভিতর দিয়ে যাওয়ার কাঠের ট্রেইল। পুরো ট্রেইলটা ঘুরে আসতে ৩০ মিনিটের মত সময় লাগে। এখানে একটি পদ্মপুকুর ও ওয়াচ টাওয়ার আছে। ওয়াচ টাওয়ার থেকে থেকে পুরো হাড়বাড়িয়া দেখা যায়। বনের ভিতরের কাঠেরপুল দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যে কারোরই অ্যাডভেঞ্চার ও শিহরণ জেগে উঠবে।

কটকা বিচ: কটকা পয়েন্ট এর টেইল ধরে আরও কিছুদূর হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে কটকা সমুদ সৈকতে। বঙ্গোপসাগরের দেখা মিলবে এইখানে। কটকা সী বিচ অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর। এখানে বেলাভূমি জুড়ে আঁকা থাকে লাল কাঁকড়াদের শিল্পকর্ম।

জামতলা সৈকত: কটকার কাছেই জামতলা । এখানে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রয়েছে, এই টাওয়ার থেকে সুন্দরবনের সৌন্দর্য্যের কিছুটা অংশে একসাথে চোখ বুলানো যায়। আর ভাগ্য ভাল থাকলে এখান থেকে হরিণ কিংবা বাঘের দেখা পেয়ে যেতে পারেন। জামতলা ঘাট থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পায়ে হাঁটা পথে গেলে দেখা যাবে জামতলা সী বীচের।

মান্দারবাড়িয়া সৈকত: মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের কিছুটা অংশ এখনো অনাবিষ্কৃত বলে মনে করা হয়। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। মান্দারবাড়ি যেতে হলে সাতক্ষীরা দিয়ে সুন্দরবন যেতে হবে।

হীরন পয়েন্ট: হীরন পয়েন্টের কাঠের তৈরি সুন্দর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হরিণ, বানর, গুইসাপ ও কুমির দেখা পাওয়া যায়। এখানেও মাঝে মাঝে বেঙ্গল টাইগারের দেখা মিলে।

দুবলার চর: সুন্দরবন এলাকার মধ্যে ছোট্ট একটি চর হচ্ছে দুবলার চর । দুবলার চরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা এবং শুটকির জন্য বিখ্যাত। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি- এই পাঁচ মাস প্রায় ১০ হাজারের মত জেলে সাময়িক বসতি গড়ে সেখানে। মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শুকানোর কাজ।

সুন্দরবন ভ্রমণের উপায়:

আপনি চাইলেই একা বা ২-৩ জন গ্রুপ করে সুন্দরবনের গহীনে ঘুরতে যেতে পারবেন না। সুন্দরবনের ভিতরে ভ্রমণ করতে হলে অবশ্যই ফরেস্ট অফিস থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে অনুমতি ও সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে ঘুরতে যেতে হবে। আর সব গুলো স্থান ঘুরে দেখতে লঞ্চ ও শীপ ছাড়া বিকল্প কিছু নেই।

নিরাপত্তা, অনুমতি, খরচ আর জটিল প্রক্রিয়ার কারণে সুন্দরবন ভ্রমণের সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায় হচ্ছে কোন ট্যুর অপারেটরের সাথে যাওয়া। প্যাকেজের মধ্যেই শীপে উঠার পর থেকে ট্যুর শেষ করে ঘাটে ফেরা পর্যন্ত থাকার ব্যবস্থা, ৩ বেলার খাবার, ২ বেলা হালকা নাস্তা, বন বিভাগের অনুমতি, নিরাপত্তা রক্ষী ও গাইড সহ সকল যাবতীয় খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।

সুন্দরবন ভ্রমণ প্যাকেজ খরচ:

সুন্দরবন ভ্রমণ প্যাকেজ এর খরচ নির্ভর করে জাহাজ ও খাবারের মান, কি কি ঘুরে দেখাবে ও কতদিনের ট্যুর তার উপর। মোটামুটি মানের শীপে ঘুরতে জন প্রতি খরচ হবে ৬০০০-১৪০০০ টাকা। আর বিলাসবহুল টুরিস্ট ভ্যাসেলে ভ্রমণ করতে চাইলে খরচ হবে জনপ্রতি ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত। প্যাকেজ গুলো সাধারণত ২ রাত ৩ দিন অথবা ৩ রাত ৪ দিনের হয়ে থাকে। আপনারা যদি একসাথে ৩০-৪০ জনের মত হয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে নিজেরাই একটা লঞ্চ বা শীপ ভাড়া করতে পারেন। এক্ষেত্রে খরচ নির্ভর করবে কোন ধরনের সার্ভিস আপনি পেতে চান তার উপর।

সুন্দরবন যাওয়ার উপায়:

সুন্দরবন যেতে চাইলে খুলনা হয়ে যাওয়া যায় অথবা মোংলা থেকে যাওয়া যায়। এই দুইটি পথই সবচেয়ে জনপ্রিয়। আর খুলনা থেকে ছেড়ে যাওয়া শীপ মোংলা হয়েই সুন্দরবনে প্রবেশ করে।

ঢাকা থেকে খুলনা বাসে বা ট্রেনে সরাসরি যাওয়া যায়। গুলিস্তান, সায়দাবাদ ও গাবতলি থেকে খুলনা যাবার নন এসি বাসের ভাড়া ৬০০-৭০০  টাকা ও এসি বাসের ভাড়া ৭০০-১৪০০ টাকা। ঢাকা থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন সকালে ছেড়ে যায়। আর চিত্রা এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সন্ধ্যায়। ভাড়া সিটের ক্লাস অনুযায়ী ৫০৫ টাকা থেকে ১৭৩১ টাকা।

ঢাকা থেকে মোংলা মোংলা যাবার সরাসরি সেমি চেয়ার কোচ বাস আছে। কমফোর্ট লাইন, দিগন্ত, রাজধানী, আরমান পরিবহনের নন এসি বাসে মোংলা যেতে খরচ হবে ৪৫০-৫০০ টাকা।

বাসে ঢাকা থেকে খুলনা বা মোংলা যেতে ৭-১০ ঘন্টা লাগতে পারে। বাস যাত্রায় যেহেতু ফেরী পাড়ি দিতে হয় তাই সময় আরও বেশি লাগতে পারে। তবে পদ্মাসেতু চালু হয়ে গেলে যাওয়ার সময় অনেকখানিই কমে যাবে।

সুন্দরবন ভ্রমণ খরচ:

কোন ট্যুর এজেন্সির সাথে ভ্রমণে গেলে সাধারণত প্যাকেজ গুলোতে সব ধরণের ফি অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাই আলাদা করে ফি দিতে হয়না। তবে একদিনে ভ্রমণে গেলে বা নিজেরা ম্যানেজ করে গেলে সেইক্ষেত্রে প্রতিটা জায়গার জন্যে প্রবেশ ফি দিতে হবে।

অভয়ারণ্য এলাকায় দেশি পর্যটকদের জন্য প্রতিদিনের জনপ্রতি ভ্রমণ ফি – ১৫০ টাকা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য – ৩০ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ ফি – ১৫০০ টাকা। অভয়ারণ্যের বাইরে দেশি পর্যটকদের ভ্রমণ ফি – ৭০ টাকা, ছাত্র-ছাত্রী- ২০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ভ্রমণ ফি – ১০০০ টাকা ও গবেষকদের জন্য ভ্রমণ ফি – ৪০ টাকা। করমজলে দেশি পর্যটকদের জন্য ভ্রমণ ফি জনপ্রতি ২০ টাকা, বিদেশিদের জন্য ৩০০ টাকা।

সুন্দরবনে রাস পূর্ণিমার সময় তীর্থযাত্রীদের ৩ দিনের জন্য জনপ্রতি ফি দিতে হয় ৫০ টাকা, নিবন্ধনকৃত ট্রলার ফি ২০০ টাকা, অনিবন্ধনকৃত ট্রলারের ফি ৮০০ টাকা এবং প্রতিদিন অবস্থানের জন্য ট্রলারের ফি ২০০ টাকা।

আরও পড়ুন